স্বচ্ছল বন্দীরা ‘রোগী সেজে’ থাকেন হাসপাতালে

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: জনবল সংকট ও যন্ত্রপাতির অভাবে চট্টগ্রাম কারা হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেই বললেই চলে। যে কারণে এই হাসপাতালে রোগী থাকেন না। তবে ‘আর্থিকভাবে স্বচ্ছল’ বন্দীরা টাকার বিনিময়ে ‘রোগী’ সেজে থাকছেন এখানে। তারা কারা হাসপাতালকে ‘আবাসিক হোটেলের’ মতো করে ব্যবহার করছেন। ফলে রোগী না থাকলেও কারা হাসাপাতালের সিট খালি থাকে না।  অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ কয়েদিরা কারা হাসপাতালের সিট পান না। হাসপাতাল দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা সহকারী সার্জনকে টাকা দিলেই কেবল মিলে এই সিট। চট্টগ্রাম কারা হাসপাতাল ঘিরে মাসে অন্তত ১৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়। কারা হাসপাতালে চিফ রাইটার (সাজাপ্রাপ্ত বন্দী) মূলত এসব টাকার লেনদেন করেন। কারা হাসপাতালের চিফ রাইটারের দায়িত্ব পালন করেন পারভেজ নামে একজন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী। চট্টগ্রাম কারাগারের সাধারণ ওয়ার্ডে খাবার, পানিসহ নানা সংকট থাকলেও হাসপাতালে এসব সমস্যা নেই। অসুস্থ কারাবন্দীদের সুবিধার্থে সাধারণ ওয়ার্ডে থাকা বন্দীদের চেয়ে কারাবিধি অনুযায়ী হাসপাতালে সুযোগ সুবিধা বেশি রাখা হয়েছে। যার কারণে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বন্দীরা টাকার বিনিময়ে ‘রোগী সেজে’ হাসপাতালে আরাম আয়েশে বন্দীজীবন কাটান। গত বুধবার বিভিন্ন মামলায় চট্টগ্রাম কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিতে আসা তিনজন বন্দীর সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন বন্দী জানান, টাকা না দিলে কারা হাসাপাতালে সিট মিলে না। সেখানে আসলে তেমন কোনো চিকিৎসা সেবা নেই। হালকা জ্বর কিংবা সর্দি হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাও বহির্বিভাগে। তবে রোগী না থাকলেও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বন্দীরা টাকার বিনিময়ে ‘রোগী সেজে’ কারা হাসপাতালে আরাম আয়েশে থাকেন।

আদালত চত্বরে তিন বন্দী জানান, বন্দীদের সাধারণ ওয়ার্ডে সকাল ৬টা থেকে ৮টা এবং বিকেল ৩টায় দুই বেলা পানি সরবরাহ করা হয়। মাঝে মাঝে তাও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তবে কারা হাসপাতালে সকাল ৬টায়, দুপুর ১টায় এবং বিকেল ৩টায় তিন বেলা পানি সরবরাহ করা হয়।

বন্দীদের দাবি- কারা হাসপাতালের রাইটারের মাধ্যমে লেনদেনের কথা পাকাপোক্ত করলে সিট মেলে হাসপাতালে। সিট পেতে প্রথম মাস গুণতে হয় ১৫ হাজার টাকা। পরবর্তী মাস থেকে গুণতে হয় ৬ হাজার টাকা করে। চাইলে মাসে ৬ হাজার টাকা দিয়ে মাসের পর মাস কারা হাসপাতালে আয়েশি জীবন যাপন করতে পারেন। টানা তিনমাস থাকলে নতুন করে ফের ১৫ হাজার টাকা ভর্তি ফি দিতে হয়। এভাবেই চলে কারা হাসপাতালের সিট বাণিজ্য। অনেক সময় দেখা যায়- কোনো বন্দী ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ১ মাসের জন্য হাসপাতালে সিট নেওয়ার দুই-একদিনের মধ্যে জামিনে বের হয়ে যান। সেক্ষেত্রে নতুন করে কেউ ভর্তি হলে তাকেও ১৫ হাজার  টাকা দিতে হয়।

টাকার লেনদেন কিভাবে হয়- এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা জানান, বন্দীর স্বজনদের সাথে কারা চিকিৎসক কিংবা রাইটারের প্রতিনিধি হিসাবে একজন কারারক্ষী টাকা সংগ্রহ করেন। বাইরে গিয়ে বন্দীর স্বজনদের সাথে দেখা করে কারারক্ষী টাকা নেন। টাকা নিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কারারক্ষী প্রতি হাজারে ১০০ টাকা কমিশন কেটে রাখেন। কারাগারের ভেতরে নানা অনিয়ম চললেও তা খুব একটা বাইরে জানাজানি হয় না। আদালতে হাজিরা দিতে আসা কিংবা কোনো বন্দী জামিনে বের হলে এসব বিষয় জানা যায়। কারা কর্তৃপক্ষ অনিয়মের বিষয় কখনো স্বীকার করে না।

কারা হাসপাতালে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কারা হাসপাতালের সহকারী সার্জন শামীম রেজা বলেন, ১০০ শয্যার কারা হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি কারাগার থেকেও প্রায় সময় অসুস্থ বন্দীদের এই হাসপাতালে পাঠানো হয়।

টাকার বিনিময়ে কারা হাসপাতালের সিটে ‘রোগী সাজিয়ে’ সুস্থ বন্দী রাখা প্রসঙ্গে চিকিৎসক শামীম রেজা বলেন, এসব কথা ঠিক নয়। তবে অনেক সময় পরিচিত অনেকের অনুরোধে দুই-একজন সুস্থ বন্দীকে হয়তো রাখতে হয়। তাও সিট খালি থাকলে। সেক্ষেত্রে কখনো এক সপ্তাহের বেশি রাখা সম্ভব হয় না। তবে অনৈতিক লেনদেন হয় না।