চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস আজ

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: অবশেষে দীর্ঘ তিন দশক পর চট্টগ্রাম গণহত্যা মামলার রায় হল। ৩২ বছর আগের ঘটনা। পুরো বাংলাদেশ চষে বেড়াচ্ছেন গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনা- যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই মানুষের ঢল।

এরূপ পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা এলেন চট্টগ্রামে ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮। গভীর কালো সুড়ঙ্গের শেষপ্রান্তে একটি মাত্র আশার বাতি জ্বলছে আর তা হল শেখ হাসিনা; মানুষ ভরসা পাচ্ছে বাংলার পরিত্রাণ আসবে নেত্রীর হাত ধরেই।

সে সময়কার স্মৃতি আজও স্মৃতিপটে উজ্জ্বল। ঠিক হল বিমানে যাত্রা ২৪ জানুয়ারি। নেত্রীর সঙ্গে জোট নেতা তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু ও অন্য নেতারাসহ কয়েকজন। তার মধ্যে আমিও ছিলাম।

তখন আওয়ামী লীগ ’৭৫-এর নির্মম আঘাত, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতার মধ্যে বিপর্যস্ত, দল বাঁচিয়ে রাখার এবং সংগঠিত করার প্রাণান্ত চেষ্টা।

যদিও ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করেছিল- আশা ছিল দেশে গণতন্ত্র ফেরত আনা যায় কি না।

সে সময় আওয়ামী লীগের অবস্থা ছিল ‘দিন আনে দিন খায়’। শেখ হাসিনা প্রবল চেষ্টায় দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মনে পড়ে যাত্রার আগের দিন তিনি আমাকে কয়েকটি বিমানের টিকিট দিতে বলেছিলেন।

তখন আওয়ামী লীগের সব কর্মীর সহযোগিতার হাত ছিল সাধ্যমতো প্রসারিত।

আজকের অবস্থা তখন অচিন্তনীয় ছিল। বর্তমানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দল সুসংগঠিত- সংগঠন কৌশলে, দূরদৃষ্টিতে ও আর্থিক কাঠামোয়। কিন্তু তখন সহজ যাত্রা ছিল না। দল ছিল অনিশ্চয়তায় দোদুল্যমান, নেতৃত্বহীনতায় পঙ্গু, হীনমন্যতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত, আর্থিকভাবে অসচ্ছল।

সে সময় আবির্ভূত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কঠিন সংকল্প, অবিচল নিষ্ঠা, ধৈর্য ও দীর্ঘ অধ্যবসায় দিয়ে পুনর্গঠিত করলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে।

শত সহস্র সাধারণ ত্যাগী নেতাকর্মী উজ্জীবিত, নিজ নিজ ক্ষুদ্র সামর্থ্য ও সাংগঠনিক তৎপরতায় হল তার সহযাত্রী। নেত্রীর নেতৃত্ব, সাহস ও অনুপ্রেরণায় সবাই মিলে সামর্থ্যমতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চালিয়েছে-শক্তি জুগিয়েছে।

মনে পড়ে আশির দশকের শেষের দিকে যখন তিনি ক্ষমতায় নেই, এমনকি ওই সময় বিরোধীদলীয় নেত্রীও নন, তিনি এলেন রংপুরে বিভাগীয় কর্মী সমাবেশে। তার দিকনির্দেশনা, সংগ্রাম ও আন্দোলনের রূপরেখা তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন পুরো বাংলাদেশে।

প্রায় ৫০০০ কর্মী ও স্থানীয় নেতাদের সমাবেশ। আমিও পৌঁছেছি রংপুর। ওই সময়ে আমার আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল।

বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুহৃদ ও শুভানুধ্যায়ী আনিসুল হক চৌধুরী আমাকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন আমার নির্বাচনী এলাকার নিভৃত নিজ গ্রামে অবস্থিত বাসস্থান ছাড়াও কাজের সুবিধার্থে মিঠাপুকুর উপজেলা সদরে আরেকটি বাসস্থান নির্মাণ করা প্রয়োজন। ওই নতুন বাড়ির কাজ শুরু করার লক্ষ্যে ওই সময় সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে এসেছিলাম।

উত্তরাঞ্চলের আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতারা নির্যাতিত ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী নয় এবং রংপুর দরিদ্র এলাকা। কিন্তু আমাদের সমাবেশ করতেই হবে এবং দূরদূরান্তের সব নেতাকর্মীকে অন্ততপক্ষে একবেলা খাওয়াতে হবে। অন্যরাও এগিয়ে এলো।

সব বন্দোবস্ত হল এবং আমার হাতের টাকাও খরচ হয়ে গেল। নেত্রী এবং আগত নেতাদের জন্য স্থানীয় সার্কিট হাউসে বিশেষভাবে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হল। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত একনাগাড়ে সভা চালালেন; কিন্তু পুরোদিন খেলেন না- শুধু শসা খেয়ে দিনটি অতিবাহিত করলেন। নামাজের সময় তিনি পাশের শিল্পকলা ভবনে সভা থেকে উঠে গিয়ে নামাজ আদায় করলেন।

তার এ ত্যাগ, তিতিক্ষা, কঠিন অধ্যবসায়, অবিচল নিষ্ঠা ও দৃঢ়সংকল্প তিনি সঞ্চারিত করলেন পুরো দেশে। আজ দল একতাবদ্ধ- একতাবদ্ধ দেশ। আজ বাংলাদেশ এক আলোচিত নাম- মানবিক দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, অসীম সম্ভাবনার দেশ ও উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত।

২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ আমরা সকালে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। বিমানবন্দর লোকে লোকারণ্য। আমাদের ও নেত্রীর জন্য খোলা ট্রাকের বহর। নেত্রী এক ট্রাকে এবং আমি অন্য এক ট্রাকে। নেত্রী কী মনে করে জানি না আমাকে তার ট্রাকে ডেকে নিলেন। আমরা জনসভার উদ্দেশে রওনা দিলাম লালদীঘির পথে। ১৫ দলীয় জোটের ওই প্রস্তাবিত সভায় তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি।

মাত্র কয়েক মাইল রাস্তা। যাওয়ার সময় যে অভূতপূর্ব দৃশ্য তা ভোলার নয়। রাস্তার দু’পাশে এবং পার্শ্ববর্তী ঘরবাড়িতে মহিলা-পুরুষ, ছাত্রছাত্রী, শিশু-কিশোর অগণিত মানুষ। চারদিকে শুধু পুষ্পবৃষ্টি ও স্লোগান। মনে হয় সেদিন পুরো দেশ ভেঙে পড়েছিল রাস্তার ওপরে শেখ হাসিনাকে অভিবাদন, অভ্যর্থনা ও সমর্থন জানানোর জন্য।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এরূপ আবেগ ও ভালোবাসার জোয়ার আর কোনোদিন আমার চোখে পড়েনি। আধা ঘণ্টার রাস্তা আমরা ৩ ঘণ্টায় অতিক্রম করলাম।

ক্রমে ক্রমে পৌঁছলাম ডিসি হিলের পাদদেশে লালদীঘি ময়দানে। চারদিকে জনতার ভিড় ভেঙে ছুটে আসছে জনতা। শেখ হাসিনা হাত নাড়িয়ে অভিনন্দনের জবাব দিচ্ছেন এবং আমাদের ট্রাকগুলো মন্থরগতিতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে মূল মাঠে।

হঠাৎ দেখি জনাব আখতারুজ্জামান চৌধুরী, তিনিও ওই ট্রাকে ছিলেন- আমার হাত ধরে টানছেন, বলছেন গুলি হচ্ছে। আমি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে ঘুরলাম, কেননা গুলি হতে হলে অবশ্যই তার পূর্ব সতর্কবার্তা ঘোষণা করতে হবে; আমার আমলা জীবনের অভিজ্ঞতা বাস্তবতার কাছে হার মানল।

মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে লুটিয়ে পড়েছে অনেকে- অনেকের মগজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে চারদিকে। সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন আহত, গাড়ি থেকে নিচে পড়ে গেছেন।

আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম কয়েকজন পুলিশ মাত্র ১০-১২ হাত দূর থেকে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার দিকে রাইফেল তাক করেছে- তারা বলছে ‘গুলি করি, গুলি করি’। সে মুহূর্ত মনে হল অনন্তকালের জন্য সময় স্তব্ধ হয়ে গেল- চরম পরিণতি এলো বলে।

কিন্তু কানে এলো নেত্রীর বজ্র কঠিন কণ্ঠ, ধমক দিলেন-‘কাকে গুলি করবে? বন্দুক নামাও’। মুহূর্তের মধ্যে যেন ত্বরিত স্পর্শে বজ্রাহত তারা রাইফেল নামিয়ে ফেলল। আমার মনে হয় পুলিশদের মাদক খাইয়ে সেদিন কর্তব্যে নিয়োজিত করা হয়েছিল এবং তারা চরম নির্দেশ নিয়েই এসেছিল- তা না হলে কী করে সম্ভব তারা সরাসরি বন্দুক উঁচিয়ে নেত্রীকে বলছে ‘গুলি করি, গুলি করি’। স্পষ্টতই তাদের মাদকসেবন করানো হয়েছে এবং তারা সরাসরি নির্দেশ পালন করছিল।

দেখলাম নেত্রীর অসীম সাহস, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব¡, রাইফেলের গুলির মুখে দৃঢ়তা ও অবিচল বিচক্ষণতা। সত্যি অভাবনীয় এবং আমার জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা। মনে হয় সেদিন আরেক জন্ম হল।

জননেত্রী শেখ হাসিনা শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি বয়ে চলেছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন এবং তার দায়ভার। তিনি বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, চেষ্টা হয়েছে বারবার তাকে হত্যা করার। তার সাহসিকতা, দৃঢ় সংকল্প তাকে অনন্য করেছে।

ডিসি কোর্ট এবং পার্শ্ববর্তী অফিস থেকে সব আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষ ছুটে এলেন এবং আমাদের সবাইকে নিয়ে এলেন বার লাইব্রেরিতে। সে রাতে আমরা রাত্রিযাপন করলাম জনাব আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বাড়িতে।

পুরো বাংলাদেশ স্তম্ভিত চট্টগ্রাম মুহূর্তে ভুতুড়ে শহরে পরিণত হল। ঢাকা শহরও তাই শুনেছি। মন্ত্রীরা জনরোষের ভয়ে তাদের সরকারি বাসভবন থেকে পালিয়ে গেছেন।

দীর্ঘ ৩২ বছর আগের এ ঘটনায় ২৪ জন মুহূর্তের মধ্যে নিহত হন এবং দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। এটি ছিল গণহত্যা। গণহত্যা পূর্বপরিকল্পিত ও শেখ হাসিনাই নিঃসন্দেহে ছিলেন আসল লক্ষ্য। নিহতদের কারও লাশ পরিবারকে নিতে দেয়নি সে সময়কার সরকার।

সাক্ষ্য-প্রমাণ গোপন ও বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে সবাইকে বালুয়ার দীঘি শ্মশানে জঘন্য নির্মমতায় পুড়িয়ে ফেলা হয়। এরশাদের পতনের পর ১৯৯২-এর ৫ মার্চ আইনজীবী মো. শহিদুল হুদা বাদী হয়ে ৪৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন; কিন্তু বিএনপি আমলে মামলার কার্যক্রম এগোয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মামলা পুনরুজ্জীবিত হয়। হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদাকে প্রধান আসামি করা হয়।

দীর্ঘ ৩২ বছর পর ২০ জানুয়ারি ২০২০-এ ৫ পুলিশের ফাঁসির হুকুম হল। প্রধান আসামি মির্জা রকিবুল হুদা ইতিমধ্যে মৃত এবং তৎকালীন প্যাট্রোল ইনসপেক্টর জেসি মণ্ডল ফেরারি।

সেদিন শেখ হাসিনার আসার পথে তিনটি ব্যারিকেড দেয়া হয়েছিল- কোতোয়ালি মোড়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ও লালদীঘি এলাকায়। প্রথম ব্যারিকেডটি সরিয়ে নেয়া হয় এবং তা ছিল কৌশল। রায়ে বর্ণিত হয়েছে, তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওয়্যারলেস সেটে নির্দেশ দিচ্ছিলেন- ‘যত পারো গুলি কর। সবাইকে শোয়ায়ে ফেল…’।

প্রশ্ন হচ্ছে, মুহূর্তের উত্তেজনায় নাকি এ ছিল ধারাবাহিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন চেষ্টা?

এইচএন আশিকুর রহমান : সংসদ সদস্য; সভাপতি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি; কোষাধ্যক্ষ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ