ঘটনার সূত্রপাত মস্কো থেকে

ঘটনার সূত্রপাত মস্কো থেকে। ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: ঢাকায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের মধ্যে তৃতীয় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ প্রশ্নে যে বিতর্ক চলছে এর সূত্রপাত হয়েছিল মস্কো থেকে। ঢাকায় দুই দেশের দূতাবাস একে অপরের বিরুদ্ধে টুইট করে ও বিবৃতি দিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। হঠাৎ কেন রুশ দূতাবাস তৃতীয় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মতো ইস্যু নিয়ে সরব হলো, সে প্রশ্ন ছিল কূটনীতিকসহ বিভিন্ন মহলে। এ নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ১৫ ডিসেম্বর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। সেই ব্রিফিংয়ের সূত্র ধরে ঢাকার রুশ দূতাবাস ২০ ডিসেম্বর একটি বিবৃতি প্রকাশ করে।

দূতাবাসের সেই বিবৃতিতে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম ব্যবহার করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর পর ২১ ডিসেম্বর ইউক্রেনে রাশিয়ার ভূমিকা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে একটি টুইট করে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। এদিন রুশ দূতাবাসও পশ্চিমা দেশগুলোকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন পোস্ট করে টুইটারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কূটনীতিক গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, মস্কো থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। একজন বলেন, মূলত রাশিয়া পুরো বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের আসল চেহারা দেখাতে চায়। সে কারণেই সম্প্রতি মস্কো বন্ধু ও সমমনা দেশের একটি তালিকা তৈরি করেছে। এর পর বন্ধু প্রতিষ্ঠানগুলোরও তালিকা তৈরি করা হবে। রাশিয়া তার বন্ধু রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে থাকবে। রাশিয়ার এ বিবৃতির বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে কোনো সমন্বয় করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই না। বাংলাদেশের ভেতর থেকে এ বিষয়ে কোনো সমন্বয় করা হয়নি।

এদিকে ২২ ডিসেম্বর মস্কোতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ নিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গতকাল রোববার ঢাকায় দেশটির দূতাবাস গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র মারিয়া জাখারেনাভার বলেন, ‘বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমরা নজরে রেখেছি। ১৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রদূত যে পরিবারের সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছিলেন, সেই পরিবারের সদস্য বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং ২০১৩ সাল থেকে নিখোঁজ। এ বৈঠকের বিরোধী ছিল স্থানীয় বেসরকারি একটি সংস্থা। সেই সংস্থার আচরণ নিয়ে এবং রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার হুমকির বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। মার্কিন কূটনীতিকের কার্যক্রমের ফলে এ ঘটনাটি প্রত্যাশিত ছিল।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের মানবাধিকার সুরক্ষার নামে ক্রমাগতভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অংশগ্রহণমূলক করা নিয়ে তাঁর মতো যুক্তরাজ্য ও জার্মান দূতাবাসের কূটনীতিক সহকর্মীরাও খোলামেলাভাবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি, অন্য সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড মৌলিক নীতির লঙ্ঘন ও অগ্রহণযোগ্য।’ যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিমুখী আচরণের বিষয়ে ইঙ্গিত করে মারিয়া জাখারেনাভার বলেন, কেউ যদি জানতে চান কূটনীতিক, দায়মুক্তি, দূতাবাস, নিরাপত্তা- এ শব্দগুলো কেমন হবে? আন্তর্জাতিক আইন এবং কূটনৈতিক ও কনস্যুলার নিয়ে ভিয়েনা সনদের অনুসরণের আহ্বান আমরা সব সময় জানাই। এটাই মূলনীতি, এটাই সত্য। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্য দেশগুলো শুধু তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়ে যত্নবান।

গত ১৪ ডিসেম্বর সকালে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ২০১৩ সালে গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বাসায় যান মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস। তবে রাজধানীর শাহীনবাগে সে বাসায় পৌঁছার আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন ‘মায়ের কান্না’ নামে আরেকটি সংগঠনের সদস্যরা। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে তাঁরা স্মারকলিপি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে কিছুটা ধাক্কাধাক্কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে সেখান থেকে স্বল্প সময়ের মধ্যে মায়ের ডাকের সঙ্গে বৈঠক শেষ করে বের হয়ে যান মার্কিন দূত। এর পর দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তুষ্টির কথা জানান তিনি। এ ছাড়া ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূতের কাছেও পিটার ডি হাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে।

গত ২০ ডিসেম্বর ভিয়েনা সনদের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ঢাকার রাশিয়া দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলে, তৃতীয় দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে রাশিয়া তার নীতিগত অবস্থানে সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ বিদেশি শক্তির নেতৃত্ব অনুসরণ না করে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের জন্য বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতি গ্রহণ করে। রাশিয়া এ দেশগুলোর আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে। এর পর এক টুইটে খবরটি উল্লেখ করে ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে কিনা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। এর জবাবে পশ্চিমা দেশগুলোকে ব্যঙ্গ করে আরেক টুইটে কার্টুন পোস্ট করে ঢাকার রুশ দূতাবাস।