কাপ্তাই হ্রদ থেকে মাছ পাচাররোধে ৪২০ অভিযান; রাজস্ব আয় ১৪ লাখ

২৩৬ বোটসহ ২.৫ লক্ষ মিটার জাল জব্দ

ছবি:সিপ্লাস টিভি
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

আলমগীর মানিক,রাঙামাটি: পাহাড় ও সমতলের বাসিন্দাদের আমিষের চাহিদা মেটানোর মৎস্য সম্পদের অন্যতম উৎসস্থল রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে বন্ধকালীন সময়েও মাছ ধরে পাচার করছে সিন্ডিকেট চক্র।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ হিসেবে পরিচিত রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের সুষ্ঠ প্রাকৃতিক প্রজনন,বংশ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে চলতি বছরের গত পহেলা মে থেকে সকল প্রকার মৎস্য সম্পদ আহরণ ও বিপণন বন্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ।

এই নিষেধাজ্ঞা কালীন কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ, নৌ-পুলিশ থেকে শুরু করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনসহ নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

কিন্তু বিদেশী রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের থেকেও আয়তনে বড় সুবিশাল কাপ্তাই হ্রদের সর্বত্র নজরদারি নাথাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কাপ্তাই হ্রদ থেকে অবৈধভাবে মাছ শিকার করে পাচার করছে অসাধু চক্র।

হ্রদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) সংস্থাটির স্বল্প জনবলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন স্থানে অবাধে মাছ ধরে সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রিসহ বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে এক শ্রেণীর অসাধু মাফিয়া ব্যবসায়ি চক্র। এতে বিপুল পরিমাণ ডিমওয়ালা মা মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে সরকার হ্রদে মাছ ধরার উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করছে তা ভেস্তে যেতে বসেছে।

এদিকে নিজেদের সামর্থনুসারে রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধ মাছ শিকার ও পাচারকারির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ।

সংস্থাটির দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, ৯৫ দিনে কাপ্তাই হ্রদে অবৈধ মৎস্য শিকারী থেকে পাচারকারিদের বিরুদ্ধে ৪২০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ১২টি কেচকি জালসহ কারেন্ট জাল, সুতার জাল, নেট জাল সবগুলো প্রায় আড়াই লক্ষ মিটার জাল, দেশীয় ইঞ্জিন বোট ২৩৬টি, তিন টনেরও অধিক মাছ, ২০০ কেজি শুটকি উদ্ধারপূর্বক জব্দ করা হয়।এসব নিলামে বিক্রি করে সরকারে কোষাগারে জমা করা হয়েছে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯১ টাকা।

রাঙামাটি কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লেঃ কমান্ডার মোঃ তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিগত বছরগুলোর ন্যায় চলতি বন্ধকালীন মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করছে বিএফডিসি ও নৌ পুলিশ কর্তৃপক্ষ।

এবছরে বিগত বছরগুলোর চেয়ে প্রায় কয়েকগুন বেশি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ মৎস্য আহরণকারি থেকে শুরু করে পাচারকারি সকলের চলাচল অনেকটা সীমিত হয়ে গেছে। তিনি জানান, আমরা বিএফডিসির পক্ষ থেকে অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছিনা; আমরা কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা যাতে এগিয়ে আসে এবং অসাধু চক্রকে রুখে দেয় সেই লক্ষে আমরা প্রতিনিয়তই সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি।

তিনি আরো বলেন, আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে এসব আটক করা গেলেও ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া যায়না।অবৈধ শিকারীদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে প্রতিদিনই কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে লেঃ কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম জানান, এবছর বিএফডিসির নিজস্ব হ্যাচারিতে স্থানীয়ভাবেই উৎপাদিত প্রায় ৬০ হাজার কেজি কার্প জাতীয় মাছের পোনা কাপ্তাই হ্রদে অবমুক্ত করা হয়েছে। রাঙামাটির প্রায় ৭২৫ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বিশাল এই কাপ্তাই হ্রদ এলাকা পাহারা দেয়ার মতো লোকবল বিএফডিসির না থাকার কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএফডিসির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়মানুসারে কাপ্তাই হ্রদ ব্যবস্থাপনায় সর্বমোট ১০২ জন লোকবল থাকার কথা কাগজে কলমে থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৭৪ জন। তার মধ্যে অনেকেই ছুটিতে আসা-যাওয়া থাকায় লোকসংখ্যা আরো কমে যায়।

এদিকে সুবিশাল কাপ্তাই হ্রদের ব্যবস্থাপনায় বিএফডিসি’র রাঙামাটি সদরে মাত্র একটি স্প্রিডবোট, লংগদুতে একটি, মহালছড়িতে একটি কাপ্তাইয়ে একটি ও মারিশ্যাতে একটি দেশীয় ইঞ্জিন চালিত বোট রয়েছে। এগুলো দিয়ে হ্রদে অবৈধ মৎস্য শিকারীদের সাথে কচ্ছপ গতিতেই লড়ে যাচ্ছে বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ।

চলতি বছরের গত পহেলা মে থেকে কাপ্তাই হ্রদের মাছের সুষ্ঠু প্রাকৃতিক প্রজনন, বংশ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন বাড়াতে চলতি বর্ষা মৌসুমে অনির্দিষ্টকালের জন্য হ্রদে সবধরণের মাছ শিকার ও আহরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।

এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ গড়ে তিনমাস থাকার কথা থাকলেও প্রাকৃতিক কারনে বৃষ্টি না হওয়ার ফলে কাপ্তাই হ্রদের পানি আশানুরূপভাবে বৃদ্ধি না পাওয়ায় এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরো ১৫দিন বৃদ্ধি করা হয়েছে।

প্রায় ২৫ হাজার জেলে পরিবার কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণের সাথে এবং ছোট-বড় মিলে অন্তত দুই হাজার ব্যবসায়ি রাঙামাটি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হ্রদের মাছ বিপণনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।