অর্থনৈতিক মন্দার আঘাত আসতে পারে দেশের রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে

অর্থনৈতিক মন্দার আঘাত আসতে পারে দেশের রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে।
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: অর্থনৈতিক মন্দার অশনিসংকেত দেশে দেশে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের উন্নত দেশের পাশাপাশি মন্দা আর ঋণ সংকটের কবলে পড়তে যাচ্ছে উঠতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেকেই। প্রায় প্রতিটি দেশের জন্যই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ডলার তেজি হওয়ায় আমদানি ব্যয় শোধে দেশে দেশে কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই মন্দার আগুনে এখন ঘি ঢালছে। বিশ্বব্যাংক সবশেষ গত বৃহস্পতিবার বিশ্ব মন্দার স্পষ্ট আভাস দিয়েছে বলেছে, এই মন্দায় মারাত্মক পরিণতি ভোগ করবে মূলত উঠতি বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো। ফলে এই ঝুঁকির বাইরে নয় বাংলাদেশও। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মন্দা বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কিছুটা কমিয়ে আনলেও এর নেতিবাচক দিকই বেশি। এতে রপ্তানি বাজার সংকুচিত হবে আর কমবে রেমিট্যান্স প্রবাহ। অন্য অনেক খাতের মতো আবাসন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতির বাইরে নয়। ইইউ এবং আমেরিকাসহ উন্নত দেশে মন্দা হলে, স্বাভাবিকভাবেই আক্রান্ত হবে বাংলাদেশ। মানুষ কেনাকাটা কমাবে। এর ধাক্কা লাগবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে। এরই মধ্যে বিশ্বের অন্তত ১০টি বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিল করেছে। রপ্তানি আদেশ প্রায় ২০-৩০ শতাংশের মতো কমেছে। সামনে এর প্রকৃত চিত্রটা আরও স্পষ্ট হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স করপোরেশন–আইএফসির সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মশরুর রিয়াজ বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনটি দেখেছেন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মন্দা হলে উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি গতি হারাবে। মানুষ ভোগব্যয় কমাবে। এতে আমাদের রপ্তানি বাজারগুলোতে মন্দা চলবে। এটাই আমাদের বড় ঝুঁকি। এর পাশাপাশি উন্নত দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহারও কমবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আয় কমবে। তখন সেখানে কর্মরত আমাদের প্রবাসীদের আয় কমবে এবং নতুন করে কর্মী যাওয়াও বাধাগ্রস্ত হবে। তাই ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক হয়ে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে।’

বিশ্বব্যাংক তাদের হালনাগাদ এক প্রতিবেদনে বলেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যেভাবে একযোগে সুদের হার বাড়াচ্ছে, তা গত পাঁচ দশকেও দেখা যায়নি। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করবে। এটা একদিকে, ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার খরচ বাড়িয়ে দেবে অন্যদিকে, ঋণ পাওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। আর এ সবকিছুর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপিতে। এতে বলা হচ্ছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া মানেই অর্থনীতিতে স্থবিরতা জেঁকে বসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়া।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, ১৯৭০ সালের মন্দার পর বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন সবচেয়ে সংকটে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতো জাপানের আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নোমুরাও বলেছে, আগামী এক বছরের মধ্যে বিশ্বের বড় বড় অনেক অর্থনীতি মন্দার কবলে পড়বে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতির হার রেকর্ড ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে এর প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো এই জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে অর্থনীতি সংকুচিত হলেই মন্দায় পড়ে যাবে বিশ্বের আরেক শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাজ্য। দেশটির অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস (ওএনএস) জানিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের মানুষ নিয়মিত খরচ কমিয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হতে চলেছে যে, আগামী অক্টোবরে যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতি ১৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। সুতরাং যুক্তরাজ্য এখন মন্দার সন্নিকটে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ছাড়াও মন্দার ঝুঁকি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ইইউর সদস্য দেশ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাকে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, মিসর, এল সালভাদর, ইথিওপিয়া, ঘানা, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, তিউনিসিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, লেবানন, রাশিয়া, সুরিনাম ও জাম্বিয়া।

বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা বলছে, সুদের হার বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে আবাসন খাতে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো সামনে এ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোও। এ ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদেরও। এ বিষয়ে রিহাবের পরিচালক প্রকৌশলী আল আমিন বলেন, ‘বিশ্বমন্দার ঢেউ আমাদের এখানেও লাগবে তাতে সন্দেহ নেই। এটা হলে এখানে মানুষ ভাত-কাপড় কিনবে, নাকি বাড়ি-ফ্ল্যাট কিনবে? সুতরাং মানুষ প্রথম যে খরচটা কমাবে সেটা হলো আবাসনসহ বড় কোনো বিনিয়োগে যাবে না। তাই সামনের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা আবাসন খাতে ব্যবসাকে ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।’