সিডিএ’র ভুলের মাশুল ১৪ কোটি টাকা, ১ নভেম্বর ভাঙ্গা হবে ১০ তলা ভবনটি

CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই নগরীর বাকলিয়া মৌসুমী আবাসিক এলাকার বাবে ইউসুফ নামের ১০ তলা ভবনে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করে অন্তত ২০ টি পরিবার। একদিন সবাই জানতে পারে এই ভবনের জায়গাটি ১৯৯৫ সাল থেকেই বাকলিয়া এক্সেস রোডের জন্যে এলাইনমেন্ট করা। ফলে বৈধ ভাবে নির্মিত হলেও এখন ভেঙ্গে ফেলতে হবে ভবনটি। ভুলক্রমে ভবন অনুমোদন দেয়ার খেসারত হিসেবে ক্ষতিপূরণ বাবদ অন্তত ১৪ কোটি টাকা দিতে হচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে।

জানা গেছে ২০১০ সালের ১৪ জুলাই আবেদনকারী কর্নেল (অব.) ইকবাল ২০৬৬/২০০৯-২০১০ নং ছাড়পত্র মূলে ‘বাবে মতিন সিটি’তে ‘বাবে ইউসুফ’ নামের ভবনটি নির্মানের জন্যে ভূমি ব্যবহার অনুমোদন পায় । পরবর্তীতে সেই ছাড়পত্রটি সংশোধনের জন্য আবারো আবেদনকারী আবেদন করলে ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সেটারো অনুমোদন দেওয়া হয়। ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের পাওয়ার ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইমারত নির্মাণ অনুমোদনের ছাড়পত্রও পেয়ে যায় আবেদনকারী। অর্থাৎ সিডিএ’র যথাযথ অনুমোদন নিয়েই নির্মিত হয় ভবনটি।

সিডিএ’র প্ল্যানিং বিভাগ ও অথরাইজ ২ এর দ্বায়িত্বরতদের চরম গাফিলতির কারণেই এখন ফেঁসে গেছে সিডিএ। ফলে এখন এই ভবনটি ভাঙ্গতে হলে দিতে হবে ক্ষতিপূরণ। জমির ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে মৌজা দরের হিসেবে ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ করা গেলেও ভবনের ক্ষতিপূরনের ক্ষেত্রে গনপূর্ত প্রকৌশলির এসেসমেন্টের ওপর নির্ধারিত হয়।

মূলত ভবনটির বয়স ও নির্মাণ উপকরণের উপর ভিত্তি করে সাধারণ, সুপার ও সুপিরিয়র এই তিন ক্যাটাগরির জন্য প্রতিবর্গফুট হিসেবে একটি সরকারি রেট রয়েছে।

তবে, ভবন মালিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে ইতিমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের মধ্যে আলোচনায় ফ্ল্যাটের ক্রয় মূল্যের পাশাপাশি রেজিস্ট্রি খরচ ও ইউটিলিটি সংযোগ বাবদ যাবতীয় খরচের হিসেব সহ তাদেরকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হবে বলে আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে এপার্টমেন্ট ভবনের ফ্ল্যাটের ক্ষতিপূরণ এবং জমির ক্ষতিপূরণ মিলিয়ে অন্তত ১৪ কোটি টাকা দিতে হচ্ছে সিডিএ কে। ইতিপূর্বে মন্ত্রনালয় থেকে ১০ কোটি টাকার একটি প্যাকেজ প্রস্তাব দেয়া হলেও সার্বিক ক্ষতি বিবেচনায় কোন ফ্ল্যাট ক্রেতা যেনো ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেই বিবেচনায় ক্ষতিপূরণের অর্থের পরিমান বৃদ্ধি করে এখন ১৪ কোটি টাকা চাওয়া হচ্ছে।

১৯৯৫ সালের মাস্টার প্লানে বাকলিয়া এক্সেস সড়কের জন্যে চিহ্নিত জায়গাটিতে ১০ তলা ভবনের প্লানটি সিডিএ’র প্ল্যানিং বিভাগ, ইমারত নির্মাণ বিভাগ ও বিশেষ কমিটি সবার হাতঘুরে অনুমোদন পেয়েও এই মারাত্মক ভুলটি কারো চোখে পড়লেও নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান বলছেন, জমির মালিক কর্নেল ইকবাল সাহেব তথ্য গোপন করে ভবনের নির্মাণ অনুমোদন নিয়ে গেছেন।

তিনি সিপ্লাসকে বলেন, এই এলাকায় মৌজা ম্যাপে দুটি আলাদা স্কেল রয়েছে। একটি মৌজা ম্যাপ রয়েছে ৬৪ স্কেলে ও অন্যটিতে ১৬ স্কেলে। এই স্কেলের পার্থক্যের কারণে সিডিএ’র কেউ জায়গাটি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারেননি এবং কারো চোখেই তা ধরা পড়েনি। ফলে সিডিএ’র প্ল্যানিং বিভাগ, ইমারত নির্মাণ বিভাগ ও বিশেষ কমিটি সবার সামনে দিয়েই ভবনটি অনুমোদন পেয়ে যায়।

ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের সময় সিডিএ’র নিজস্ব সার্ভেয়ার সরেজমিন জমি পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিল করে থাকে। এক্ষেত্রে তাদের চোখেও এই ভুল চিহ্নিত না হওয়ার পেছনে অন্য কোন কারণ আছে কিনা প্রশ্ন করা হলে শাহীনুল ইসলাম খান জানান, বিষয়টি আমরা বিভিন্ন ভাবে তদন্ত করে দেখেছি।

কোথাও না কোথাও কারো ভুল অবশ্যই হয়েছে তবে ভবনটির আবেদনকারী নিজেও তথ্য গোপন করার পাশাপাশি কৌশলে এলাইনমেন্টের জায়গাতেই প্রথম ভবনটি নির্মাণ করেছে। যেহেতু এক্সেস রোডের কাজ শেষ করতেই হচ্ছে তাই আইনী জটিলতা এড়িয়ে ভবনের বিরোধ মিমাংসা করার পথেই সিডিএ এগুচ্ছে বলে জানান প্রধান স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান।

সিডিএ’র ভুলের জন্যে জনগনের অর্থ মাগুল দেয়ার কারণে দায়িদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের স্বিদ্ধান্তের বিষয়।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে একনেক সভায় বাকলিয়া এক্সেস সড়কটি নির্মাণের জন্য ২০৫ কোটি ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। যা ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এখন আইনী জটিলতায় পড়ে পুরো প্রকল্প ব্যহত হওয়ার আশংকা থেকে ভবন মালিক ও ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের সাথে আপোষের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দিয়েই ভাঙ্গতেই হচ্ছে ভবনটি। ৬০ ফুট চওড়া এই রোডটি চন্দনপুরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পুকুরের কর্নার দিয়ে গিয়ে ডিসি রোডের সাথে যুক্ত হবে। আবার ডিসি রোড থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণে বেঁকে বগার বিল, সৈয়দশাহ রোড অতিক্রম করে শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়কের সাথে মিলিত হবে বাকলিয়া এক্সেস রোড। এই এক্সেস রোড নির্মানের পরিকল্পনাটি ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যানে প্রস্তাবনায় থাকায় এর এলাইনমেন্টের স্থানে কোন ভবন অনুমোদন দিতে পারেনা সিডিএ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নির্মানাধিন এক্সেস রোডের সেই প্রকল্পের এলাইনমেন্টের রাস্তার মাঝে আরো অন্তত ৪ টি বহুতল বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। বড় ভবনটি ভাঙ্গার সময় অন্যান্য ভবন গুলোও ভাঙ্গা হবে বলে সিডিএ সূত্র জানিয়েছে।