“সাঁড্গাইয়ে বুলি” একটি ভাষা, কোন পঁচা বা অবহেলার ভাষা নয়

প্রসঙ্গ: সাঁড্গাইয়ে বুলি (পর্ব-১)

মুহাম্মদ রেজাউল করিম
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

বৃহত্তর চট্টলার অনেক মাতৃভাষার মধ্যে ‘সাঁড্গাইয়ে বুলি’ অন্যতম এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা। আমাদের এ ভাষা অযৌক্তিভাবে উপভাষার তকমা মাথায় নিয়ে ঘুরছে অনেক আগে থেকেই। ইদানিং এ ভাষার উপর রোহিঙ্গাকরণের যে দখিনা হাওয়া বইছে তা একদিন সাঁড্গাইয়ে বুলিকে রোহিঙ্গা ভাষার উপভাষা হিসেবে পরিণত করবে। এ বিষয়ে লেখাটা দায়িত্ববোধের মধ্যে পড়ে বলেই লেখা এবং লেখে যেতে হবে। লেখাগুলোতে আমার ভাষা বিষয়ক প্রকাশিতব্য বইগুলোর লেখা সংযোজন হবে।

‘সাঁড্গাইয়ে’ শব্দটা চট্টলার আদি বা খাঁটি শব্দ। এ শব্দটিকে ‘সিটেইংগে’ও বলে। ‘সিটেইংগে’ শব্দটি Chittagong থেকে এসেছে (চিটাগং˃সিটেং˃সিটেই্ংগে)। বাংলায় যেটি ‘চাঁটগাইয়া’। আবার রোহিঙ্গা এবং আরাকান থেকে বিভিন্ন সময়ে আসা অনেকেই চাঁটগাইয়া বা সিটাইঙ্গা বলে। সাঁড্গাইয়ে বা সিটেই্ংগে এবং চাঁটগাইয়া বা সিটাইঙ্গা শব্দগুলোর একট ব্যাাকরণগত এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে, যা পরের কোন পর্বে লিখব। আজকের পর্বে ভাষা নিয়েই লিখছি।

ভাষা এবং সংস্কৃতির উপর নানান প্রভাব কাজ করে। তন্মধ্যে রাজনৈতিক এবং অন্য ভাষার ও সংস্কৃতির আগ্রাসন অন্যতম। ২০ শতকের শেষ এবং ২১ শতকের শুরুর দিকে মধ্যবিত্ত শ্রেনির মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, নগরমুখি হয়ে নিজেদের আধুনিক করে তোলারও একটা কুপ্রভাব আমাদের ভাষা এবং সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব পড়েছে। চট্টলার ভাষার দিন দিন করুন অবস্থা হওয়ার পিছনে যারা সবচেয়ে বেশি দায়ী তারা চট্টলার-ই। যারা কিনা নিজেদের ভাষাকে পঁচা ভাষা, এটা কোন ভাষা না এসব বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। এ পর্বে আমি ভাষা এবং ইসলাম ধর্মে ভাষার গুরুত্ব নিয়ে লিখছি।

ভাষা
মানুষকে “আশরাফুল মাখ্লুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব”এবং সামাজিক জীব বলার অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষ মুখের ভাষার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে। মানুষের মুখের ভাষা-ই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করে সভ্য সমাজের শ্রেণিভুক্ত করেছে। মানুষের আবেগ, অনুভূতি, আকাঙ্খা মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। এক কথায় মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম-ই হলো ভাষা। তাই ভাষার সংজ্ঞায় বলা যায়-মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য মানুষ অপরের বোধগম্য যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারণ করে থাকে, তাকে ভাষা বলে। নিম্মে বিভিন্ন ভাষাবিদের ভাষা সংক্তান্ত সংজ্ঞা প্রদান করা হলো।

Robertson and Cassidy, 01)

Language is the vocal and audible medium of human communication.

(Bloch and Trager, 5)

A language is a system of arbitrary vocal sounds which a social group that cooperates.

(‘Language’, def.)

A system of communication consisting of a set of small parts and a set of rules which decide the ways in which these parts can be combined to produce that have meaning.

(‘Language’,def., 1.a)

The words, their pronunciation and the methods of combining them used and understood by a community.

(সেন,১৫)
মানুষের উচ্চারিত,অর্থবহ বহুজনবোধ্য ধ্বনিসমষ্টিই ভাষা।

(শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ,১)
মনুষ্য জাতি যে ধ্বনি বা ধ্বনি-সকল দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করে, তাহার নাম ভাষা।

(মুখোপাধ্যায়,অশোক,১৭৭)
কণ্ঠনিঃসৃত অর্থবহ ধ্বনি সমষ্টির সাহায্যে মানুষের মনের ভাব প্রকাশ ও আদান-প্রদানের স্বাভাবিক মাধ্যমের নাম ভাষা।

উপরোল্লিখিত সংজ্ঞাগুলো থেকে ভাষার যে বৈশিষ্টগুলো পায় তা হলো-
-কণ্ঠনিঃসৃত এবং শ্রবণযোগ্য ধ্বনি যা দ্বারা মানব সমাজ ভাব আদান-প্রদান করে বা মনের ভাব প্রাকাশ করে।
-ধ্বনি সমষ্টির উচ্চারণ যা কোন সম্প্রদায়ে ব্যবহৃত এবং বোধগম্য।
-মানুষের উচ্চারিত ধ্বনিসমষ্টি যা অর্থবহ এবং বহুজনবোধ্য।

তাহলে আমরা অবশ্যই বলব যে, বৃহত্তর চট্টলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা “সাঁড্গাইয়ে বুলি” একটি ভাষা। এটি কোন পঁচা ভাষা বা অবহেলার ভাষা নয়। কারণ, এ ভাষায় ভাষার সব উপাদান-ই বিদ্যমান।

ইসলাম ধর্মে ভাষার গুরুত্ব
প্রত্যেকটি ভাষা আল্লাহ্ প্রদত্ত।কারণ, ভাষার মাধ্যমেইতো মানুষ আল্লাহর কাছে র্প্রাথনা করে এবং আল্লার প্রশংসা করে। মানব জাতির ভাষা এবং ভাষা বৈচিত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় নিয়ামত। এই ভাষা বৈচিত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ্্ রাব্বুল আ‘লামীন ইরশাদ করেন:

وَمِنْ آَيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِلْعَالِمِين
(সূরা রূম-২২)

র্অথ:তার নির্দেশনাবলীর মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী, পৃথিবীর সৃিষ্ট এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। এতে অবশ্যই জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে। (সূরা রূম-২২)

নি:সন্দেহে, নি:সংকোচে এবং দৃঢ কন্ঠে বলা যায়, সাঁড্গাই্য়ে ভাষা সাঁড্গাই্য়েদের জন্য আল্লাহ্ প্রদত্ত দান বা নিয়ামত এবং সম্পদ। সাঁড্গাইয়েদের এ ভাষা ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের সবচেয়ে পুরনো এবং মূল্যবান অংশ বা বিষয়। তাহলে বুঝা যায় যে, এ ভাষাকে অবহেলা করা বা অবমূল্যায়ন করা খুবই জঘণ্য বা গর্হিত কাজ এবং মূর্খতার সর্বনিম্ম র্পযায়ের পরিচায়ক। ইসলাম ধর্মে ভাষার গুরুত্ত¡ অপরিসীম সেটা আলেম সমাজকে বুঝতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে বুঝাতে হবে। কিন্ত দুঃখের ব্যাপার যে, বর্তমান আলেম সমাজ এ বিষয়ে এখন খুবই উদাসীন।

আমরা হতাশা হচ্ছি না এবং হালও ছাড়ছি না। ২০ শতকে চট্টলার সাঁড্গাইয়ে বুলির একটা রেনেসাঁ শুরু হয়েছে। এটা শুরু হয়েছে ফাহাদ লোকমানের হাত ধরে।এ ভাষা নিয়ে কাজ করছে Cplus TV। চট্টলার আদি বা খাঁটি ভাষার জন্য একাডেমিক কাজ করছে Chittagonian Language Center(CLC)। ইনশা আল্লাহ্ , আমাদের ভাষা চট্টলা এবং বিশ্বের বুকে গৌরবের সাথে টিকে থাকবে।

References

1) Robertson, Stuart and Frederic, Cassidy. The Development of Modern English. Englewood : N J:Pentice-Hall,1954.

2) Bloch, Bernard and George, Trager. Outline of Linguistic Analysis. Linguistic Society of America, 1942.

3) “Language, N”. Cambridge International Dictionary of English, Economy Education, Cambridge University Press, 1995, P.795.

4) “Language, N.(1.a)”.https://www.merriam-webster.com/dictionary/language. 21 Julay,2021

৫) সেন,সুকুমার। ভাষার ইতিবৃত্ত। আনন্দ,২০১৫।
৬) শহীদুল্লাহ,মুহাম্মাদ। বাঙ্গালা ব্যাকরণ। মাওলা ব্রার্দাস,ঢাকা। ১৪১০।
৭) মুখোপাধ্যায়,অশোক। সংসদ ব্যাকরণ অভিধান। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৯৯৫।

লেখক
মুহাম্মদ রেজাউল করিম
ইংরেজি শিক্ষক, গিয়াসউদ্দীন ইসলামিক মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, নারায়ণগঞ্জ।