সম্মেলনকে ঘিরে রওশন-কাদের শিবিরে আবারও অনৈক্য

CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

দলের জাতীয় সম্মেলনকে ঘিরে আবারও জাতীয় পার্টি (জাপা)-তে অনৈক্যের সুর বেজে উঠেছে। পার্টির পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচন ও কমিটিতে সাদ এরশাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিভক্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রওশনপন্থীরা চান, চেয়ারম্যান পদ থেকে গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে সরানোর পাশাপাশি দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে সাদ এরশাদকে নিয়ে আসতে। আর জিএম কাদেরকে নতুন কমিটিতেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার বিষয়ে অনড় তার অনুসারীরা। এ ক্ষেত্রে সাদ এরশাদকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্তিসহ প্রয়োজনে কোনও কোনও ক্ষেত্রে ছাড় দিতে আপত্তি নেই তাদের। তবে, তারা কোনও ধরনের ছাড় দেবেন না চেয়ারম্যান ইস্যুতে। জাপার উভয়পন্থী একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

এরআগে, গত ১৪ জুলাই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর ৪ দিন পর ১৮ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দেন দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। এরপর ২৩ জুলাই জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে অস্বীকার করে বিবৃতি দেন রওশন এরশাদসহ দলের সাত জন সংসদ সদস্য ও দুই জন প্রেসিডিয়াম সদস্য। তবে, পরবর্তী সময়ে এরশাদের চেহলাম উপলক্ষে কয়েকটি মিলাদ মাহফিলে একসঙ্গে দেখা যায় রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরকে। এরপর গত ৮ সেপেম্বর রওশন এরশাদকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং জিএম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান করার মধ্য দিয়ে ওই সময়ে সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসা করা হয়।

এদিকে, নতুন মহাসচিব নির্বাচনেও উভয়পন্থীদের ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। বর্তমান মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে স্বপদে রাখতে কাদেরপন্থীরা নমনীয় হলেও রওশনপন্থীদের রয়েছে ভিন্ন চিন্তা। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের সময় রাঙ্গার ভূমিকা রহস্যঘেরা ছিল রওশনপন্থীদের কাছে। তাদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে তিনি দুই পক্ষের মধ্যস্থতা করলেও ভেতরে ভেতরে ছিলেন কাদেরপন্থীদের পক্ষে।

রশনপন্থীরা বলছেন, জিএম কাদের আগামী সম্মেলন পর্যন্ত জাপার চেয়ারম্যান। নিয়ম অনুযায়ী তিনি সম্মেলনের আগে চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। এরপর নির্বাচন কমিশন চেয়ারম্যান পদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবে। তখন কাউন্সিলররা মৌখিক বা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবেন। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেওয়া হবে না। আর তাকে চেয়ারম্যান পদ দিলেও মহাসচিব পদে ও প্রেসিডিয়াম সদ্যস্যে রওশনপন্থীদের ছাড় দেওয়ার শর্ত থাকবে। এছাড়া, সাদ এরশাদকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ে আনারও শর্ত দেবেন রওশনপন্থীরা।

আগামী সম্মেলনে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরকে রাখা হবে কিনা, জানতে চাইলে রওশনপন্থী প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘কাউন্সিলের মাধ্যমে আগামী দিনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। ফলে কাউন্সিলের মাধ্যমে আগামীতে জিএম কাদের আবারও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারেন, আবার অন্য কেউও হতে পারেন।’

আগামী সম্মেলনে চেয়ারম্যান পদে রওশন এরশাদ প্রার্থী হবেন কিনা, জানতে চাইলে আনিসুল ইসলাম বলেন, ‘এটি নিয়ে কথা বলার এখনও সময় আসেনি। কাউন্সিলের সময় দেখতে পাবেন কে হচ্ছেন চেয়ারম্যান।’

রওশনপন্থী জাপার আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, ‘বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের কাউন্সিলের আগে পদত্যাগ করবেন। এরপর নির্বাচন কমিশন, চেয়ারম্যান পদে আগ্রাহী প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবে। তখন সরাসরি বা মৌখিক ভোটের মাধ্যমে পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবে। একইভাবে মহাসচিব পদেও নির্বাচন হবে।’

আগামী কাউন্সিলে চেয়ারম্যান পদে রওশন নির্বাচন করবেন কিনা, জানতে চাইলে ফখরুল ইমাম বলেন, ‘‘এটি তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তবে এ বিষয়ে এখনও ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার সময় আসেনি।’’

সাদ এরশাদ আগামী কমিটিতে থাকার প্রসঙ্গে ফখরুল ইমাম বলেন, ‘এখন তিনি দলের সাধারণ সদস্য হিসেবে রংপুর-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করছেন। আগামী কাউন্সিলে তিনি দলের কমিটিতে আসবেন। তবে কোন পদে আসবেন, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রওশনপন্থী একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘আগামী সম্মেলনে জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে, এর বিনিময়ে সাদ এরশাদকে কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হবে। পাশাপাশি মহাসচিব পদে ও প্রেসিড়িয়াম সদস্যে রওশনপন্থীদের বেশি ছেড়ে দেওয়ারও শর্ত দেওয়া হবে। যেন পার্টির মধ্যে কাদেরের বলয় রওশনপন্থীদের চেয়ে দুর্বল থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রংপুর-৩ আসন উপ-নির্বাচনে সাদ এরশাদ বিজয়ী হয়ে এলে সম্মেলন নিয়ে আমাদের এক ধরনের কৌশল হবে। আর নির্বাচনে পরাজিত হলে আরেক ধরনের কৌশল নির্ধারণ করা হবে।’

কাদেরপন্থীরা বলেন, সংসদের নেতৃত্ব রওশন এরশাদকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনোভাবেই দলের নেতৃত্ব থেকে সরে আসা যাবে না। সম্মেলনের পরে নতুন কমিটিতে জিএম কাদেরকে যে-কোনও মূল্যে চেয়ারম্যান করা হবে। আর মহাসচি পদেও নিজেদের বিশ্বস্ত অনুসারীকে রাখা হবে। সেক্ষেত্রে রওশনপন্থীদের কোনও ছাড় দিতে হলেও কোনও আপত্তি নেই।

জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘সম্মেলনের সময় চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করা নতুন কোনও বিষয় নয়। এটি সব দলেই হয়ে থাকে।’

নতুন কমিটিতে চেয়ারম্যান পদে থাকবে কিনা বা সম্মেলনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হবেন কিনা, জানতে চাইলে জিএম কাদের বলেন, ‘না থাকার কী আছে এখানে?’

জিএম কাদেরপন্থী হিসেবে পরিচিত জাপা নেতা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আগামী সম্মেলনের পরে জাপার নতুন কমিটিতে চেয়ারম্যান পদে জিএম কাদেরই থাকবেন। এর বাইরে অন্য কোনও খবর আমার কাছে নেই।’

পরবর্তী কমিটিতে সাদ এরশাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মাসুদ উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনও কিছু জানা নেই। তিনি থাকলে চাইলে থাকবেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জিএম কাদেরপন্থী একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘পার্টির মূল ভিত্তি রংপুরকে কেন্দ্র করে। ফলে রংপুরের মানুষ চায়, এরশাদের ভাই হিসেবে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে। ফলে এ পদে অন্য কোনও লোক আসার কোনও সুযোগ নেই। আর সাদ এরশাদ কমিটিতে আসতে চাইলে আসবেন।’