সমীক্ষাতেই নয় বছর,চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প

অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চিত্র। 
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: নয় বছর ধরে সমীক্ষাতেই ঝুলে আছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেন করার প্রকল্প। ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে ২০১৩ সাল থেকে গত নয় বছরে চারবার সমীক্ষা চালিয়েছে দেশি-বিদেশি চার প্রতিষ্ঠান। তবে এখনও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করতে পারেনি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর।

পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও বান্দরবানকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা মহাসড়কটি দীর্ঘদিন সম্প্রসারণ না হওয়ায় যানবাহনের চাপে যানজট যেমন হচ্ছে তেমনি দুর্ঘটনাও বাড়ছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের শিকলবাহা ক্রসিং থেকে ইন্দ্রপুল পর্যন্ত একাধিক অংশ ভেঙে গেছে। ইট, কংক্রিট দিয়ে এ অংশটি সচল রাখা হয়েছে। চন্দনাইশের হাশিমপুর ও দোহাজারী অংশে রয়েছে একাধিক মোড়। লোহাগাড়া থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অন্তত ৩১টি স্থানে রয়েছে বিপজ্জনক বাঁক। আঁকাবাঁকা এবং সরু হওয়ায় এই মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিন প্রাণহানি ঘটছে।

এরমধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকায় পিকআপ ভ্যানের চাপায় পাঁচ সহোদর এক সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, আঁকাবাঁকা ও সরু হওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে গড়ে ১৫টি দুর্ঘটনা ঘটছে।

সূত্র জানায়- ২০১৩-১৫ সময়ে সুইডিশ কনসালট্যান্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষা প্রতিবেদনে ২২৫ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতের সুপারিশ করা হয়। ওই সময় ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে এটি ‘কন্ট্রোলড-একসেস হাইওয়ে’ হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু করে সওজ। কমে যায় মহাসড়কটির দৈর্ঘ্যও। পরিবর্তিত দৈর্ঘ্য ধরা হয় ১৩৬ কিলোমিটার। এজন্য ১৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবও (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয়।

ওই নকশায় মহাসড়কটির প্রশস্ততা ধরা হয় ৮২ ফুট। দুই পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য থাকবে পৃথক লেন। পাশাপাশি ৩৩টি সেতু, ১৩৯টি কালভার্ট, ১৩টি ফুটওভার ব্রিজ ও দুটি ফ্লাইওভারে কথা বলা হয়েছে। মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ৩১৬ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। পরবর্তীতে জি-টু-জি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক চার লেনে উন্নীত করতে সমীক্ষা করে জাপানের মারুবেনী। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে মহাসড়কটি নির্মাণের পরিকল্পনা করে সরকার। ২০১৯ সালে প্রকল্পটির ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে তা আলোর মুখ দেখেনি।

সর্বশেষ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে করা এ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন ২০২১ সালের ডিসেম্বরে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সওজের প্রধান প্রকৌশলী একেএম মনির হোসেন পাঠান জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ডিপিপি তৈরি হলে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ইতোমধ্যে সড়কটির চার স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে ছয় লেনের চার সেতু। যানজট এড়াতে জনবহুল চার স্থানে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে বাইপাস সড়ক নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়। তবে জাইকা ছয় লেনের বাইপাস নির্মাণ করতে গেলে বাধ সাধে সওজ। সওজের ভাষ্য-মহাসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে চার লেনের। তাই বাইপাসও চার লেনের নির্মাণ করতে করতে হবে। না হয় বাইপাসের প্রবেশ পথে যানজট তৈরি হবে।

সওজের দোহাজারী সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে সর্বশেষ জাইকা ও বুয়েট মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা চালিয়েছে। মহাসড়ক চার লেনের হলেও বাইপাসগুলো ছয় লেনের করে নির্মাণ করতে চাচ্ছে জাইকা। এ কারণে ছয় লেনের বাইপাস নির্মাণের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে সওজ। চার লেনের বাইপাস নির্মাণ করতে জাইকাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা শেষ হলেও মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। চার লেনের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক নির্মাণের বিষয়টি মাথায় রেখে সড়কের চারটি স্থানে ছয় লেনের সেতু নির্মাণ করছে সওজ। এরমধ্যে চন্দনাইশের বরুমতি খালের উপর সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পটিয়ার ইন্দ্রপুল, দোহাজারীর শঙ্খ নদী ও চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর উপর আরো তিনটি ব্রিজের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। কথা ছিল এসব ব্রিজের নির্মাণ কাজ শেষ হলে চন্দনাইশের দোহাজারী, লোহাগাড়ার আমিরাবাদ, সাতকানিয়ার কেরানী হাট এবং চকরিয়ায় বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হবে। জাইকা এসব বাইপাস নির্মাণে অর্থায়ন করবে। বাইপাসের পর সড়ক নির্মাণ করা হবে।