সন্দ্বীপে জেএসসি পরীক্ষায় অতিরিক্ত কেন্দ্র ফি কমানোর দাবী অভিবাবকদের,সাধারণ শিক্ষকদের অসন্তোষ

CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় অতিরিক্ত কেন্দ্র ফি আদায়ের অভিযোগ তুলে তা কমানোর দাবী জানিয়েছে সন্দ্বীপ উপজেলার পরীক্ষার্থীদের অভিবাবকরা ।

অভিবাবকদের দাবী পরীক্ষায় কেন্দ্র পরিচালনার খরচের তুলনায় কয়েকগুণ বেশী ফি আদায় করা হচ্ছে । দুই বছর আগে থেকে পরীক্ষার বিষয়ের সংখ্যা কমে অর্ধেক হলেও অদৃশ্য কারণে কেন্দ্র ফি এর পরিমাণ কমেনি।

অন্যদিকে পরীক্ষায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালনকারী সহকারী শিক্ষকদের মাঝেও সম্মানি ভাতা নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবী, তিন ঘন্টার পরীক্ষায় তাদের পর্যবেক্ষক ফি দেওয়া হচ্ছে অতি সামান্য। ডিউটি বন্টনে কেন্দ্র সচিবদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের অভিযোগ উঠেছে। সহকারী শিক্ষকদের অভিযোগ তাদের পাশ্ববর্তী অথবা নিজ বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে তাদের কোন পরীক্ষার্থীরা না থাকা সত্বেও তাদের সেখানে ডিউটি দেওয়া হচ্ছেনা। কেন্দ্র সচিবরা চাপে রাখতে তাদের অনেক দূরের কেন্দ্রে ডিউটি দিচ্ছে।

জানাযায়, দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপে জেএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ফি বাবদ পরীক্ষার্থী প্রতি ৩০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। শুরু থেকে মোট চৌদ্দটি পত্রের পরীক্ষা হলে নেওয়া হলেও ২০১৮ সাল থেকে পরীক্ষা অর্ধেক কমিয়ে সাতটি করা হয়। কিন্তু পরীক্ষা কমলেও কেন্দ্র ফি আদায় হচ্ছে আগের মত।

অন্যদিকে কেন্দ্রের যাবতীয় খরচের জন্য কেন্দ্র ফি নেওয়ার নিয়ম হলেও বর্তমানে অতিরিক্ত ফি আদায় করে এটিকে ব্যাবসায় রুপান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন সচেতন মহল। অনুসন্ধানে জানাযায়,উপজেলায় জেএসসি পরীক্ষার ৬ টি কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ৪ জন পুরাতন ও ২ জন নতুন কেন্দ্র সচিব দায়িত্ব পালন করছেন । পরীক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা না করে সচিবরা নিজেদের সুবিধা আদায়ে এদের মধ্যে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। সিন্ডিকেটে নতুন সচিবদের মতামতকে উপেক্ষা করে পুরাতনরা সবকিছু করছে।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা তাদের পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র গুলোতে সমস্যা হবে এই ভয়ে কেন্দ্র সচিবদের নির্ধারিত ফি নিয়ে কথা বলতে পারছেননা। কেউ তাদের মতামতে দ্বিমত পোষণ করলে তাকে বাকীরা বিভিন্নভাবে নাজোহাল করার প্রমাণ রয়েছে।

প্রতি বছর পরীক্ষার পূর্বে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে পরীক্ষা পরিচালনার বিষয়ে কেন্দ্র সচিবদের সভা হয়। সভায় পরীক্ষার কেন্দ্র ফি ও পর্যবেক্ষকদের ডিউটি নির্ধারণ করা হয়।

সহকারী শিক্ষক মো. আকতার হোসাইন বলেন, আমার স্কুলে কেন্দ্র রয়েছে কিন্তু আমাদের পরীক্ষার্থীরা ভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে। এরপরেও আমরা বাড়ি থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সাইকেল চালিয়ে ডিউটি করতে হচ্ছে।দেড় ঘন্টা আসা-যাওয়া,৩ ঘন্টা পরীক্ষা ও পরীক্ষার আগে পরে আরো এক ঘন্টা সহ মোট সাড়ে ৫ ঘন্টা শ্রম দিয়ে ভাতা পাচ্ছি মাত্র ১৩০ টাকা। সাইকেল ছাড়া গাড়িতে আসাযাওয়া করতে খরচ হয় ১৫০ টাকা।

জেএসসি পরীক্ষার শুরুর সভায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কম এবং চট্টগ্রাম থেকে মালামাল আনা-নেওয়া খরচ বেশী হয় এমন অজুহাত দেখিয়ে বোর্ডের নির্দেশ অমান্য করে ৩০০ টাকা করে কেন্দ্র ফি নির্ধারণ করা হয়।

১০ বছর পরেও নির্বাহী অফিসারের সভায় সন্দ্বীপের জেএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ফি আগের মত থেকে যায়।

অভিযোগ রয়েছে সভায় সচিবরা সিন্ডিকেট করে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করার অজুহাত দেখিয়ে তাদের পূর্ব নির্ধারিত মতামত বাস্তবায়ন করিয়ে নেয়। ২০১৮ সালের পরীক্ষায় চারজন সচিবের বিরুদ্ধে জোট হয়ে নিজেদের সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৭ সালের রেজুলেশনকে পুনরায় উপস্থাপন করে সবার মতামত বলে চালিয়ে তা পুনরায় সভার রেজুলেশন করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অতিরিক্ত কেন্দ্র ফি আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নুরুল হুদা বলেন, কেন্দ্র ফি কমানোর কোন সুযোগ নেই।আগে যা ছিল তাই নির্ধারণ করা হবে। তবে পরীক্ষার বিষয় অর্ধেক হওয়ার পরেও কেন্দ্র ফি কেন কমবেনা সেই বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

তবে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহাবুব হাসান জানান, বোর্ড নির্ধারিত কেন্দ্র ফি এর অতিরিক্ত টাকা আদায় করার কোন সুযোগ নেই। এই বিষয়ে অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে দেখাযায়, চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপের কেন্দ্রগুলোর মালামাল একইসাথে ট্রলারে করে সন্দ্বীপ আনা হয়। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গুদাম থেকে কেন্দ্র স্কুলের স্টোর রুমে এক বস্তা উত্তরপত্র আনতে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। পরীক্ষার পর এক কেন্দ্রের উত্তর পত্র পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডে পৌঁছাতে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা। প্রতিদিন একজন পর্যবেক্ষককে সম্মানী ভাতা দেওয়া হয় মাত্র ১৩০ টাকা।

কেন্দ্র স্কুল গুলোতে যাবতীয় অবকাঠামো ঠিক থাকায় পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এগুলো আলাদা করে কোন খরচ করার প্রয়োজন পড়েনা।

ফলে কেন্দ্র সচিবদের পরীক্ষার উত্তরপত্র আনা-নেওয়া, থানা থেকে প্রশ্নপত্র আনা, পর্যবেক্ষক ও কর্মকর্তাদের সম্মানি ভাতা মনিহারী ক্রয় ছাড়া আর কোন খরচ নেই।

সন্দ্বীপের একজন পরীক্ষার্থীর সাত বিষয়ে পরীক্ষা নিতে যাবতীয় খরচ হয় সর্বোচ্চ ১২০ থেকে ১৩৫ টাকা পর্যন্ত । জেএসসি পরীক্ষার শুরুতে কেন্দ্র ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল একশ টাকা। সন্দ্বীপ ও তিন পার্বত্য অঞ্চলের সচিবরা পরীক্ষার্থী সংখ্যা কম ও পরীক্ষার মালামাল আনা-নেওয়ার খরচ বেশী হয় দাবী করে বোর্ডের নিকট আবেদন করে।পরে সবগুলো শিক্ষা বোর্ডে কেন্দ্র ফি আরো পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দেড়শ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু সন্দ্বীপে বোর্ড নির্ধারিত ফি অমান্য করে তার দ্বিগুণ ফি আদায় করছে।

একটি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অভিবাবক সদস্য আবদুর রহিম শিবলু সিপ্লাসকে বলেন, সরকার যেখানে শিক্ষাকে বিনামূল্যে সেবা হিসাবে প্রদান করছেন কেন্দ্র সচিবরা সেখানে সন্দ্বীপের প্রায় ৬ হাজার পরীক্ষার্থী থেকে ১০ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত আদায় করে পরীক্ষাকে ব্যাবসা হিসাবে নিয়েছেন।

রহমতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো.ইলিয়াস বলেন, দশ বছর আগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। এখন তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার সাথে খরচের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। আবার পরীক্ষার সংখ্যাও কমেছে। তাই পরীক্ষার কেন্দ্র ফি কমানো উচিত। বর্তমানে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রত্যেক কেন্দ্র সচিবদের খরচের পরেও লক্ষাধিক টাকা থেকে যায়।

তবে সন্দ্বীপ এবি হাই স্কুল কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, কেন্দ্র পরিচালনা করতে বিভিন্ন খাতে বিভিন্ন প্রকার খরচ করতে হয়।এখানে ব্যাবসার কিছু নেই।