লোডশেডিং ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত পোলট্রি খাত

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: ঢাকার বাজারে বর্তমানে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ১৭৫-১৯০ টাকা; প্রতি হালি ব্রয়লার মুরগির ডিম এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫০ টাকায়

  • চাহিদা কমে যাওয়ায় হ্যাচারিতে বাচ্চা উৎপাদন কমেছে প্রায় ২৫-৩০%
  • গড়ে ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এর সময় জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে
  • পরিবহন খরচ বেড়েছে ২৫-৩০%
  • এক মাসের ব্যবধানে মুরগির দাম বেড়েছে ২২.০৩%
  • একটা ডিমের দাম এখন ১২ টাকার বেশি

এখনও পুরোপুরিভাবে মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারা পোলট্রি খাত এখন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লোডশেডিং এবং জ্বালানির রেকর্ড পরিমাণে মূল্যবৃদ্ধিতে।

প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এর কারণে পোলট্রি বাচ্চা, মাংস ও ডিমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় তৈরি হয়েছে সরবরাহ ঘাটতি।

এছাড়া, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাড়তি উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় যুক্ত হয়ে হু হু করে বাড়ছে মুরগি ও মাংসের দাম।

ঢাকার বাজারে বর্তমানে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ১৭৫-১৯০ টাকা। বেড়েছে ডিমের দামও। প্রতি হালি ব্রয়লার মুরগির ডিম এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫০ টাকায়, অর্থাৎ একটি ডিম কিনতে গেলে ভোক্তাকে গুণতে হচ্ছে ১২-১২.৫ টাকা।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর বাজার বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, এক মাসের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২২.০৩ শতাংশ এবং ডিমের দাম হালিতে ১৫.৩৮ শতাংশ বেড়েছে।

পোল্ট্রি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, খামাড়িরা এখন মুরগির বাচ্চা কিনতে ভয় পাচ্ছে। কারণ একটি খামাড়ে বিদ্যুতের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ দরকার। ৮-১০ ঘণ্টার লোডশেডিং এর প্রভাব মোকাবেলায় ছোট খামাড়িরা জেনারেটর ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেকের মুরগি মারা যাচ্ছে।

খরচ বহন করতে না পেরে অনেকেই উৎপাদন বন্ধ করে দিচ্ছে। যে কারণে সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে।

রংপুর সদর উপজেলা পোল্ট্রি শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আরমানুর রহমান বলেন, “আমার এলাকার ছোট ও মাঝারি যত খামাড়ি আছে তাদের অনেকেই বিদ্যুতের সমস্যার কারণে উৎপাদন বন্ধ করে দিচ্ছে। কারণ উচ্চ দামের জ্বালানি দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে খরচ উঠানো সম্ভব না।”

এই গরমে জেনারেটর ছাড়া যারাই মুরগি উৎপাদন করছে তাদেরই অনেক মুরগি মারা যাচ্ছে, বলেন তিনি।

তেজগাঁওয়ে ব্রয়লার মুরগির পাইকারী বিক্রেতা মো. মাসুম গণমাধ্যমকে জানান, তেজগাঁওয়ের আড়তে মূলত উত্তরাঞ্চল থেকে মুরগি আসে বেশি। আগে যেখানে গাড়িভাড়া ছিল ২০-২২ হাজার টাকা সেটা এখন ২৫-২৭ হাজার টাকা হয়ে গেছে। কিন্তু মুরগির সরবরাহ কম।

সব মিলিয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এখন পাইকারীতেই মুরগির দাম পড়ছে ১৬০ টাকা।

অন্যদিকে যেসব হ্যাচারি, ব্রিডার্স ফার্মে মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে সেখানেও লোডশেডিং এর কারণে অতিরিক্ত সময় জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাচ্চার উৎপাদন খরচও বেড়েছে ২.৫-২.৭৫ টাকা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, খামাড়িরা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে সেটার ধারণা পাওয়া যায় বাচ্চার চাহিদা কমে যাওয়া থেকে। বর্তমানে একদিনের বাচ্চার চাহিদা কমে গেছে ২৫-৩০ শতাংশ। অন্যদিকে বেড়েছে উৎপাদন খরচ।

১৫ দিন আগেও যেসব মুরগির বাচ্চা বিক্রি হয়েছে ১৫ টাকার আশপাশে সেগুলোর এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ টাকায়।

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান বলেন, “আমার ব্রিডিং ফার্ম হলো টাঙ্গাইলের মধুপুরে। সেখানে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনদিন এটা ১৬ ঘণ্টাও হয়ে যায়। বাধ্যতামূলকভাবে আমাকে জেনারেটরের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।”

“জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বেড়েছে তাতে আমরা কুলিয়ে উঠতে পারছি না। একদিকে বাচ্চার উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে চাহিদা কমে গেছে। তাপমাত্রা হেরফের হওয়ায় ডিম নষ্ট হচ্ছে, বাচ্চা অপুষ্ট হচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।

উদ্যোক্তাদের হিসাবে, যারা এখন ব্রয়লার মাংস উৎপাদন করছে তাদের ব্যয় বেড়ে গেছে। প্রতিকেজি মাংসের উৎপাদনে ব্যয় ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে পরিবহন, মার্কের্টিংসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ঢাকার আড়তে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। যা খুচরা বাজারে ১৭৫-১৯০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে।

আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু লুতফে ফজলে রহিম খান গণমাধ্যমকে বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে মাংসের কনজাম্পশন কমে গেছে অন্তত ৩০ শতাংশ। এই ধারাবাহিকতায় আমরা যে বাচ্চা উৎপাদন করছি তার ২৫-৩০ শতাংশ বাচ্চা বিক্রি করতে না পেরে নষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছি.”

খামাড়িরা এত খরচ দিয়ে মুরগি পালন করে পোষাতে পারছেন না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ১ মাস আগের হিসাবে মুরগির বাচ্চার উৎপাদন ছিল প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। যার পুরোটাই সরবরাহ করেন স্থানীয় ব্রিডার বা হ্যাচারি মালিকরা। প্রতিটি বাচ্চা উৎপাদনেই এখন আড়াই থেকে পৌনে তিন টাকা পর্যন্ত খরচ বেড়েছে।

ডিম থেকে বাচ্চা তৈরিতে ইনকিউবেটরসহ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডে একেকটি বাচ্চার শুধুমাত্র উৎপাদন খরচ ৩৯.৫ টাকা। অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এর বিক্রয়মূল্য ৪৫ টাকা, কিন্তু বাজারে বাচ্চা বিক্রি করতে হচ্ছে ২৭-৩০ টাকার মধ্যে। এখানেও লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তবে কী পরিমাণ খামাড়ি উৎপাদন থেকে সরে যাচ্ছে তার সঠিক হিসেব সংশ্লিষ্টরা এখনই দিতে পারছেন না।

নাহার এগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান বলেন, “চলমান পরিস্থিতিতে পোলট্রি শিল্পের প্রান্তিক উদ্যোক্তারা হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের টিকিয়ে রাখতে দ্রুত পোল্ট্রি বোর্ড গঠন করে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।”

“কী করা যায় বা কী করা উচিত সেই নীতি এখনই ঠিক করতে না পারলে ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে যাবে। স্বল্প মূল্যের মাংস ও ডিমের যোগান দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে তখন,” যোগ করেন তিনি।