রিকশাওয়ালাকে রিফাতের শেষ কথা: ‘চাচা আমারে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়া যান’

নতুন ভিডিওতে দেখা গেছে, মিন্নি একাই স্বামী রিফাত শরীফকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন
একটা ছেলে গায়ে রক্তমাখা, রক্ত ঝইর‌্যা পড়তেছিল। সে হাঁইটা আইসা আমার রিকশায় উঠেই কইল, চাচা আমারে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়া যান।’

বরগুনার আলোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার রিফাত শরীফকে হাসপাতালে নিয়ে যান ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক দুলাল। দুলালের সঙ্গেই রিফাতের শেষ কথা হয়।

দুলালের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের ফরাজীরপুল এলাকায়।

সোমবার রিফাতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

রিফাতের বাবা অভিযোগ করেছিলেন, মিন্নি তার স্বামী রিফাতকে নিয়ে হাসপাতালে যাননি, রিফাত একাই হাসাপতালে গিয়েছিলেন। কিন্ত হাসপাতালের সামনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় মিন্নিই রিফাতকে হাসপাতালে নিয়েছিলেন।

মঙ্গলবার দুপুরে দুলালের বাড়ি গিয়ে জানা যায় তিনি ধান মাড়াইয়ের কাজে গিয়েছেন। বাড়ি থেকে একটু দূরেই ফরাজী বাড়ির সামনে রিকশা চালক দুলালকে পাওয়া যায়। তিনি এ সময় ধান মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পরিচয় জানার পর প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হন দুলাল।

ঘটনার বিবরণে দুলাল বলেন, “ওইদিন কলেজ সড়কে খ্যাপ নিয়ে গিয়েছিলাম। মানুষের ভিড়ের কারণে আর সামনের দিক যাইতে পারি না। শুনলাম সামনে কারা যেন কারে মারতেছে। প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দিয়ে আমি রিকশা ঘুরাইয়া কেবল দাঁড়াইছি, এ সময় একটা ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় হাঁইট্টা আইসা আমার রিকশায় উইঠাই কয়- চাচা আমারে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়া যান।”

দুলাল বলেন, “আমি দেখলাম গলা ও বুকের বামপাশ কোপে কাইট্টা রক্ত বাইর হইতেছে। হের জামাডা টাইন্না আমি গলা ও বুকে চাইপ্পা ধইরা হেরে কইলাম আপনে চাইপ্পা ধরেন, আমি চালাই। আমি হাসপাতালে যাওনের জন্য কেবল সিটে বসছি, চালামু, ঠিক সেই মুহূর্তে একটা মেয়ে দৌড়ে রিকশায় উইঠা ওই পোলাডারে ধইর‌্যা বসে। আমি তারাতারি রিকশা চালাইয়া হাসপাতালের দিকে যাই।”

দুলাল বলেন, রিফাত এক মিনিটের মতো ঘাড় সোজা করে বসেছিলেন; কিন্ত এরপর সেই মেয়েটির কাঁধে ঢলে পড়ে যান। আর ঘাড় সোজা করতে পারেননি।

তাদের রিকশার পাশাপাশি একটা লাল পালসার মোটরসাইকেলে দুজন ছেলে যাচ্ছিল। মিন্নি চিৎকার করে তাদের কাছে রক্ত থামানোর সাহায্য চাইছিলেন, কিন্তু ওরা সাড়া দেয়নি বলে দুলাল জানান।

“আমার কাছে মিন্নি ফোন চায় তার বাড়িতে কল করে জানানোর জন্য, কিন্ত আমার ফোন নাই।”

দুলাল বলেন, পরে ওই মোটরসাইকেলের ছেলেদের কাছেও মিন্নি ফোন চান তার বাবার কাছে ফোন করার জন্য। কিন্ত তারা তাদের কাছে ফোন নেই বলে জানায়।

দুলাল বলেন, “ওই ছেলেগুলো বলে-আমাদের কাছে ফোন নাই, তুমি হাসাপাতালে যাইতেছ যাও।”

দুলাল বলেন, “হাসাপাতালের গেট থেকে ঢোকার সময় মিন্নি একজন লোককে ডাক দেন। রিকশা থামানের সাথে সাথে ওই লোক দৌড়ে এসে রিফাতের অবস্থা দেখেই আমায় নিয়ে স্ট্রেচার আনতে যায়। আমি আর সেই লোক স্ট্রেচার নিয়ে এসে রিফাতকে রিকশা থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে তুলে অপারেশন থিয়েটারে দিয়ে আসি।”

এরপর রিফাতকে অ্যাম্বুলেন্স করে বরিশাল নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ এসে তার রিকশার ছবি তুলে নেয় ও কাগজপত্র নিয়ে যায়। তার কাগজপত্র এখন পুলিশের কাছেই আছে বলে দুলাল জানান।

মিন্নির ডাকে ছুটে এসেছিলেন যিনি

হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে ও রিকশাওয়ালা দুলালের বর্ণনামতে রিকশা থামতেই সাদা গেঞ্জি পরা একজন লোক দৌড়ে এসে স্ট্রেচার এনে রিফাতকে দ্রুত ওটিতে নিয়ে যান। তিনি আমিনুল ইসলাম মামুন। বরগুনা জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি একই সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ী। মামুনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়।

মামুন বলেন, “মিন্নির ডাক শুনেই দ্রুত আমি ছুটে আসি। রিফাতের অবস্থা দেখে আমি দ্রুত রিকশাচালক ভাইকে নিয়ে হাসপতালের জরুরি বিভাগ থেকে স্ট্রেচার নিয়ে আসি। এসময় রিফাত রিকশায় মিন্নির কাঁধে ভর করে বসেছিল।

“আমি, রিকশাচালক আর মিন্নি তিনজনে মিলে রিফাতকে ধরে স্ট্রেচারে তুলি। দ্রুত তাকে ওটিতে নিয়ে যাই। এ সময় ডাক্তারের লিখে দেওয়া স্লিপ নিয়ে আমি তিনবার ফার্মেসী থেকে এক হাজার চারশ টাকার ওষুধ কিনে আনি। রিফাতের শরীর থেকে প্রচুর রক্ষক্ষরণ হচ্ছিল। কিছুতেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা যাচ্ছিল না।”

চিকিৎসক কোপের ক্ষতস্থানে গজ ও তুলো দিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দ্রুত বরিশাল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন বলে জানান মামুন।

তিনি বলেন, “আমি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে গেটে নিয়ে আসি। এর মধ্যেই রিফাতের বন্ধু জনসহ অন্যরা সেখানে আসেন। মিন্নির চাচা সালেহ ও পরে মিন্নির বাবা কিশোরও চলে আসেন।”

পরে রিফাতকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বরিশাল নিয়ে যাওয়া হয়। মিন্নি বারবার যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্ত তার চাচা সালেহ ও বাবা কিশোর যেতে দেননি বলে মামুন জানান।

গত ২৬ জুন বরগুনা জেলা শহরের কলেজ রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাতকে। ওই ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় নামে। ওই ভিডিওতে স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নিকে চেষ্টা চালাতে দেখা গিয়েছিল।

এরপর ২ জুলাই এ হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

এ ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় রিফাতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে মামলায় ১ নম্বর সাক্ষী করা হয়।

কিন্তু মিন্নির শ্বশুরই পরে হত্যাকাণ্ডে পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ তোলেন। এরপর ১৬ জুলাই মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরে সেদিন রাতে তাকে রিফাত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। হাই কোর্ট থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন নিয়ে এখন বাবার বাড়িতে রয়েছেন তিনি।