রাঙামাটি শহরে দম্পতিকে কন্যাদের সামনেই পাশবিক নির্যাতন, আটক ৩

রাঙামাটি শহরে দম্পতিকে কন্যাদের সামনে এভাবেই বেঁধে পাশবিক নির্যাতন করা হয়
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি প্রতিনিধি: রাঙামাটি শহরে প্রকাশ্য দিবালোকে এক হিন্দু দম্পতিকে অর্ধউলঙ্গ করে হাত-পা বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে প্রভাবশালী একটি চক্র। নির্যাতিত দম্পতির স্বামী মানসিক রোগী হওয়ায় অনেকটা অসহায় অবস্থায় একঘরে করে রাখা হয়েছে তাদের। উক্ত ভুক্তভোগী পরিবারটির পাশে কেউ কাউকে দাঁড়াতেও দিচ্ছেনা প্রভাবশালী মহলটি। এদিকে এই নির্যাতিত পরিবারটির বসবাসের একমাত্র বসতঘরটির খুটিও কেটে দেওয়া হয়েছে।

রাঙামাটি শহরের বাসিন্দা সুভাষ দাশ ও তার স্ত্রী মুন্নি দাশ তাদের দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে পৌর কলোনী এলাকায় বাস করছিলেন দীর্ঘদিন ধরেই। গত কয়েক আগে থেকেই সুভাষ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই তিনি এলাকার বিভিন্ন জনের সাথে রূঢ় আচরণ করতে থাকেন। এলাকার কিছু যুবক চাঁদা উঠিয়ে সুভাষের চিকিৎসাও করাচ্ছিলেন। সুভাষের এই ধরনের আচরণে প্রতিবেশী কয়েকজনের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয় এবং তারা সুভাষকে প্রায় সময় বেদড়ক মারধর করতো।

বিয়ষটি নিয়ে সুভাষের স্ত্রী মুন্নী বেশ কয়েকবার বাধা দিলে তাকে মারধরের হুমকি দেওয়া হতো। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ আগস্ট, শুক্রবার সামান্য কথাকাটাকাটিকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট দুইটি কন্যা সন্তানের সামনেই সুভাষ ও তার স্ত্রীর উপর হামলে পড়ে এলাকার বেশ কয়েকজন পুরুষ। সেসময় সুভাষ ও তার স্ত্রীকে প্রায় অর্ধ উলঙ্গ করে বেদড়ক পেঠানোর পাশাপাশি হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়।

এসময় স্থানীয় কয়েকজন সচেতন যুবক বিষয়টি কোতয়ালী থানা পুলিশকে অবহিত করে প্রভাবশালীদের কবল থেকে ভুক্তভোগীদের উদ্ধারের অনুরোধ জানায়। ঘটনার দিন শুক্রবার রাতেই কোতয়ালী থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নির্যাতিত দম্পতিকে বাধা অবস্থা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারনে সেদিন থেকে শুরু করে চারদিনেও মামলা রেকর্ড করা হয়নি।

এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি সংগঠিত হওয়ার চারদিনেও সংশ্লিষ্ট রাঙামাটি কোতয়ালী থানা পুলিশ মামলা না নেওয়ায় স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিক কর্তৃক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ষ্ট্যাটাস দেওয়ায় বিষয়টি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মুহুর্তের মধ্যেই ঘটনাটি নিয়ে নেটিজেনরাসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিন্দার ঝড় উঠলে টনক নড়ে পুলিশের।

পরবর্তীতে বুধবার দুপুরে ভিকটিম নারীকে থানায় ডেকে নিয়ে মামলা রেকর্ড করে কোতয়ালী থানা পুলিশ। মামলা নাম্বার-১০। তারিখ: ২৫/০৮/২০২২ইং। বুধবার রাত পর্যন্ত এই ঘটনায় জড়িত তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনার সাথে জড়িতদের স্বজনদের দাবি, উক্ত দম্পতির স্বামী একজন মানসিক প্রতিবন্ধী এবং তিনি এলাকার অনেককে মারধর করতেন। তাই অতিষ্ট হয়ে এলাকাবাসী উক্ত স্বামী ও স্ত্রীকে বেঁধে রাখার ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। আইনের আশ্রয় না নিয়ে এই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা কেন ঘটিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি কেউই।

এদিকে, সভ্য সমাজে প্রকাশ্যে এই ধরনের ঘটনাটি ঘটলেও মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে পূজা উদযাপন পরিষদ, সনাতন যুব পরিষদ থেকে শুরু করে নারীবাদী সংগঠনগুলো ও নারীদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে নির্যাতিতদের পাশে কেউই দাঁড়ায়নি বলে জানিয়েছে ভিকটিম গৃহবধু। একটি প্রভাবশালী মহল এই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্ঠা করেছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার সম্পর্কে জানতে চাইলে সনাতন যুব পরিষদের নেতা অজিত মুঠোফোনে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে সামাজিকভাবে বসেছিলাম কিন্তু অসুস্থ হওয়ায় ভিকটিম না আসায় পরবর্তীতে আবারো বৈঠক করার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর করিম আকবর জানিয়েছেন, আমি ঘটনাটি শুনার পরপরই এলাকায় গিয়ে বিস্তারিত জেনেছি। সুভাষ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। যতই দোষই করুক না কেন, এভাবে স্বামী স্ত্রীকে বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করার কোনো অধিকার কারো নেই। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক মন্তব্য করে এই ঘটনার সাথে জড়িত সকলকেই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে এই ধরনের ঘটনা রাঙামাটি শহরে প্রকাশ্যে ঘটেছে আর ভুক্তভোগী পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় বলে এবং এই ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নারী নেত্রী টুকু তালুকদার।

সার্বিক বিষয়টি বর্তমানে পুলিশের কড়া নজরদারিতে রয়েছে এবং এই ব্যাপারে মামলাও রেকর্ড করা হয়েছে; সে মোতাবেক এই ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার সর্বাত্মক প্রচেষ্ঠা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মারুফ আহাম্মেদ।

ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় রাঙামাটির সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে। নিন্দনীয় এই ঘটনার সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ঘটনার নির্মমতার শিকার দম্পতি ও তাদের শিশু সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।