ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে যাচ্ছে বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি

প্রতীকী ছবি
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ সংকট কোটি কোটি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রান্তে ঠেলে দিবে। দেখা দিবে নজিরবিহীন অপুষ্টি ও দুর্ভিক্ষ।

ইংরেজির ‘অ্যাপোক্লিপস’ শব্দের বাংলা দাঁড়ায় পৃথিবী সম্পূর্ণ ধবংসের আগে আসা কোনো মহাদুর্যোগ। যে দুর্যোগের তীব্রতা আমাদের চিরচেনা দুনিয়ার অন্ত ঘনিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়। গ্রিক ভাষায় মূল শব্দ-   অ্যাপোকালিপসিস- এর অর্থ কোনো কিছু প্রকাশ পাওয়া বা কোনো কিছুর ঢাকনা সরিয়ে ফেলা।

গত সপ্তাহে শেষে উল্লেখিত সংজ্ঞাটিই যেন বেছে নেন ব্যাংক অভ ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি। তিনি অনুধাবনবশতই স্বীকার করেছেন, খাদ্যপণ্যের ‘অ্যাপোকেলিপ্টিক’ মাত্রার মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে ব্রিটেন। স্বীকারোক্তিখানি এতটা অকপট ছিল যা ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ বা টোরি দলের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের ক্ষুব্ধ করে। তাদের অভিযোগ, গভর্নর সরাসরি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে দোষের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

আসলে বেইলি মূল বক্তব্যটি রেখেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চরম আঘাতে দরিদ্র দেশগুলোয় দেখা দেওয়া খাদ্যপণ্যের কল্পনাতীত মূল্যস্ফীতি ও সেই সূত্রে খাদ্য সংকট নিয়ে। তার ভাষায়, “উন্নয়নশীল বিশ্ব নিয়ে উদ্বেগ কোনো অংশে কম নয়। আমার কথাগুলি ‘অ্যাপোকেলিপ্টিক’ শোনালে তার জন্য ক্ষমা চাইছি, কিন্তু সে মহাদুর্যোগই আমাদের মূল দুশ্চিন্তার কারণ।”

উন্নত বিশ্ব সব সময়েই ‘চাচা আপনি বাঁচা’ নীতিতে চলে; তা সে হোক ‘প্রাণ’ বা যেকোনো স্বার্থ। কোভিডের টিকা সহায়তা দেওয়া নিয়েও প্রথমদিকে তাদের গড়িমসি দেখেছে বিশ্ববাসী। যুক্তরাজ্যের রেকর্ড মূল্যস্ফীতি নিয়ে তাই বিশ্ব গণমাধ্যমে বেশিরভাগ বিশ্লেষণ আসছে।

এনিয়ে দেশটির রাজনৈতিক পরিক্রমার খবরাখবরও আলোচনায় আসছে নিয়মিতই। দরিদ্র দেশের কথা ভাববার অবসর সেখানে নেই। বেইলি কিন্তু সে ধারা ভেঙ্গেও মুখ খুলেছেন। তার মতো উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মন্তব্যটি একারণে সময়োচিত এবং অনেক কিছুকে তাদের বিষয় গুরুত্ব অনুসারে যোগ্য আলোচনা স্তরে তুলে ধরেছে।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার বিশ্বের অন্যতম প্রধান দানাদার শস্য সরবরাহক। তাদের মধ্যে যুদ্ধের কারণে গত কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু, তাতে পশ্চিমা দেশের সরকারগুলো কান দেয়নি। উল্টো যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তা বাড়িয়েছে। রাশিয়ার পরাজয়ই তাদের একমাত্র লক্ষ্য, এজন্য গরিব দেশের ওপর মূল্যের চাপের পরিণতিকে দেখেও না দেখার ভান করেছে তারা।

এরমধ্যেই জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবিক ত্রাণ সহায়ক সংস্থাগুলো পৃথিবীব্যাপী অনাহার ও অপুষ্টিতে জীবনহানি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা করছে।

এনিয়ে গেল সপ্তাহে আরও একবার সতর্ক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ। তিনি বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সরবরাহ সংকট “কোটি কোটি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রান্তে ঠেলে দিবে।” ফলে নজিরবিহীন অপুষ্টি ও ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে- যা কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। আরও বেড়ে যাবে বৈশ্বিক মন্দার সম্ভাব্য ঝুঁকি।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রক্ষেপণ অনুসারে, প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ অনাহারে ভুগতে চলেছে। রাতের আহার থেকে বাদ পড়বে অন্তত ৮১ কোটি মানুষ। খরা ও সহিংসতা পীড়িত আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের ঘটনা ২০১৯ সালের মহামারি পূর্ব সময়ের চেয়ে ১০ গুণ বাড়বে।

ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্বের গম রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ করতো। তাদের অন্যান্য প্রধান কৃষি রপ্তানির মধ্যে আছে ভুট্টা, যব ও সূর্যমুখীর তেল। রাশিয়ার আগ্রাসনের পর এসব পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে বিশ্ববাজারে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চল থেকে রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় প্রধান এই শস্যগুলির দাম বিশ্ববাজারে আকাশ ছুঁয়েছে ইতোমধ্যেই।

যুদ্ধের কারণে চলতি বছর ইউক্রেনে গমের উৎপাদন ৩৫ শতাংশ কম হওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। তাছাড়া, কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার নৌ অবরোধ থাকায় ইউক্রেন নিজেদের উৎপাদিত শস্য রপ্তানিও করতে পারছে না। সব মিলিয়ে গত মার্চেই জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ইউএন-ফাও) এর নিত্যপণ্য সূচক সকল সময়ের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে যায়। এখনও তা ওই রেকর্ড মাত্রাতেই রয়েছে।

রাশিয়ার শুরু করা যুদ্ধ খাদ্যের আগের ঘাটতিগুলোকেও চরম করে তুলেছে। তীব্র করেছে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি। তার সঙ্গে মহামারির অভিঘাতগুলি যেমন- বৈশ্বিক সরবরাহ চক্রের সংকট, কর্মসংস্থানের ঘাটতির মতো অন্যান্য অনুঘটক যোগ হয়েছে। জলবায়ু সংকটের ভয়াল পরিণতিও আরেক ত্রাস। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো প্রধান প্রধান শস্য উৎপাদনকারী দেশে দাবদাহে ফলন ব্যাহত হয়েছে। জ্বালানির বাজারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এতে বাড়ছে ফসল উৎপাদনের খরচ। বিশ্বের অন্যান্য স্থানে চলমান যুদ্ধ-সংঘাতও রাখছে মারাত্মক ভূমিকা। সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তায় এক অন্ধকার সময় দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্রাজিল ও মিশরের মতো মধ্য আয়ের দেশের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলার শক্তি অনেক কম। আন্তর্জাতিক ঝুঁকি পরামর্শক সংস্থা ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট গত সপ্তাহে প্রকাশিত তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন এ তথ্য। তারা আরও জানায়, করোনা মহামারি মোকাবিলা করতে করতে- এরমধ্যেই অনেক উন্নয়নশীল দেশের সরকারের বাড়তি আমদানি খরচ বহনের অর্থায়ন ক্ষমতা বহুগুণে কমে গেছে। এজন্য তাদের অনেক ঋণও নিতে হয়েছে।

প্রতিবেদনটি বলেছে, “স্বল্প আয়ের দেশ না পারলেও মহামারিকালে মধ্য আয়ের দেশগুলি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু, এই মুহূর্তে তারা সরকারি ব্যয় আর বাড়াতে পারছে না। অথচ এর ওপর নির্ভরশীল বিপুল জনসংখ্যার জীবনযাত্রার মান।” খাদ্যে প্রণোদনা ও ভর্তুকির সহায়তা ছাড়া মূল্যস্ফীতির আরও চরম আঘাত ধেয়ে আসছে।

আর্জেন্টিনা, তিউনিশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনের মতো খাদ্য ও জ্বালানি আমদানিতে অতি-নির্ভরশীল রাষ্ট্রসহ অন্যান্য মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশে মূল্যস্ফীতির কারণে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকিও প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে বলে রিপোর্টটি ইঙ্গিত দেয়।

খাদ্য পরিস্থিতির ‘অ্যাপোক্লিপস’ বা অন্ত ডেকে আনা দুর্যোগে সব দেশেই সমাজের সবচেয়ে দরিদ্রদের ভোগান্তি হবে বর্ণানাতীত। এই নিয়তি যেন বার বার তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও শূন্যের কোঠায় ঠেলে দিচ্ছে। সে তুলনায় কিছুটা বিত্তশালীরা হয়তো খাদ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ এড়াতে পারবেন। তবে সে সুরক্ষা একটা পর্যায় পর্যন্ত কাজ করবে। অর্থাৎ, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের সামনেও ধেয়ে আসছে সংকট কাল।

মানুষের আর্থিক দৈন্যতা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ডেকে আনবে, সৃষ্টি করবে আরও বড় মানবিক সংকট। পৃথিবীজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করবে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান