বিদ্যুতে বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ‘অযৌক্তিক ব্যয়’: ক্যাব

CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

রোববার রাজধানীর ডিআরইউ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভোক্তার অধিকার রক্ষায় নাগরিকদের সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাব নেতারা বলেছেন, ইতোমধ্যেই তারা উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে বিভিন্ন ‘অযৌক্তিক ব্যয়ের’ একটি ফর্দ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে দিয়েছেন। বিদ্যুতের ব্যয় কমাতে ক্যাবের আবেদনের বিষয়ে বিইআরসির উত্তরের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বিদ্যুতের দাম বাড়াতে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের ওপর ইতোমধ্যেই গণশুনানি শেষ করেছে বিইআরসি। গত ৩ ডিসেম্বর শুনানি শেষ হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী আগামী তিন মাসের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

তবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো আগামী জানুয়ারি থেকেই বর্ধিত মূল্য কার্যকরের কথা বলেছে। গত ২৮ নভেম্বর গণশুনানি শুরুর প্রথম দিন থেকেই সেখানে অংশ নিয়ে বিদ্যুৎখাতে নানা অনিয়ম, অপচয়, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলেন ক্যাবসহ বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

সংবাদ সম্মেলনে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান ছাড়াও জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম, ক্যাবের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধান ও গবেষণা কমিশনের সভাপতি সৈয়দ আবুল মকসুদ, একই কমিশনের সদস্য অধ্যাপক বদরুল ইমাম ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী রেন্টাল বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাবে ১৩০৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ অর্থ দেয় পিডিবি। সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পর্যাপ্ত হওয়ার পরেও সরকার বিশেষ প্রয়োজনে চালু করা এই নিয়ম এখনও ধরে রেখেছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ।

এদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলের নামে গ্রাহকের কাছ থেকে ২১৭৬ কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে, যা অযৌক্তিকভাবে ব্যয় করা হচ্ছে বলে মনে করছে ক্যাব।

সঞ্চালন পর্যায়ে ‘সিস্টেম লস’ বাড়িয়ে ধরায় অতিরিক্ত ১১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে মনে করছে ক্যাব।

তারা বলছে, পাইকারি বিদ্যুতে পিডিবি মুনাফা করছে ৫০০ কোটি টাকা, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে তাদের মুনাফা করার সুযোগ নেই। সরকারের নানা ভুল নীতির কারণে পাইকারি বিদ্যুতে ঘাটতি হচ্ছে ৪৫০০ কোটি টাকা, সেই ভারও গ্রাহকের ওপর চাপানো হচ্ছে। এছাড়া সঞ্চালন ও বিতরণে লভ্যাংশ বাড়ানোর কারণে ১৩ কোটি টাকা, বিতরণে পিডিবি ও আরইবির (পল্লী বিদ্যুৎ)  মুনাফার কারণে ১৯৮৮ কোটি টাকা এবং আরইবিতে জনবল ও অবচয় বাবদ ৮০২ কোটি টাকা (মোট ১০,৫৪৯ কোটি) ‘অযৌক্তিক ব্যয়’ হচ্ছে।

এই ‘অযৌক্তিক ব্যয়’ সমন্বয় করার পর পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের মূল্যহার এবং সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ক্যাব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, ২০০৯ সালের দিকে ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাস থেকে উৎপাদন হলেও এখন সেটা কমে ৬০ শতাংশে নেমেছে। নতুন করে যোগ হয়েছে ব্যয়বহুল এলএনজি, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর ‘কুফল’ গিয়ে পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।

“সাশ্রয়ী জ্বালানি পেতে সরকারের পরিকল্পনা খুবই দুর্বল। গত ১০ বছরে সাগর থেকে গ্যাস উৎপাদনে কোনো অগ্রগতি নেই।”

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে গত ১০ বছরে পাইকারিতে ৭ বার আর খুচরায় ৯ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

“এটা খুবই অন্যায়। রাষ্ট্র কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। অথচ সরকার মুনাফার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।”

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, সমুদ্র জয়ের পর বেশ ডামাডোল শোনা গেলেও এখন আর এ নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্র ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলনে অনেক এগিয়ে।

বিদ্যুতের বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে ‘চুরির প্রবণতার’ কারণেই এখন দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

“অনেকে বলেন, বিদ্যুতে প্রচুর অপচয় হচ্ছে। আমি বলব- এগুলো অপচয় নয়, এগুলো সরাসরি চুরি,” বলেন মোবাশ্বের।

অন্য বছরের মতো এবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে ক্যাবের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, “যেহেতু বিইআরসি একটি আইনি কর্তৃপক্ষ। আমরা তাদের দ্বারস্থ হয়েছি এ নিয়ে। তারা কি আমাদের আবেদন ফেরত দয় না কি গ্রহণ করে, তার জন্য অপেক্ষা করা হবে।

“যদি ফেরত দেয় তাহলে সেখানে কী উত্তর আসে তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এখনই আদালতে যাওয়ার প্রসঙ্গ নেই।”