বাড়বে মূল্যস্ফীতি, চাপে পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষ

প্রতীকী ছবি
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: একদিকে মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে ডলার নিয়ে হাহাকার। আবার চলতি হিসাব ভারসাম্যে বা ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ক্ষেত্রে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঘাটতির মধ্যে পড়েছে দেশ। অর্থনীতির এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যে জ্বালানি তেল ডিজেল, পেট্রল, কেরোসিন ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে, বাড়বে বিভিন্ন পণ্যের দাম। ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে। চাপে পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষ। এমনটাই অভিমত দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, ভর্তুকির চাপ কমানোর জন্য এক ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু এ ব্যবস্থাপনা ভোক্তা এবং উৎপাদকের স্বার্থের অনুকূলে যাচ্ছে না। এমন সময়ে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন এমনিতেই ভোক্তা একটা মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারী, উৎপাদক ও ভোক্তা সবার ওপর চাপ বাড়বে।

চলতি অর্থবছর দেশে ১৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতি রয়েছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো অর্থবছরে এত বড় ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতি দেখা যায়নি। আবার চলতি বছরের জুনের তুলনায় জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও তা প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা জুনে ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার (৫ আগস্ট) রাতে প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিন ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ এবং পেট্রল ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার, যা রাত ১২টার পর থেকেই কার্যকর হয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বাড়বে অনেক খাতে। পরিবহন খরচ বাড়বে। তাতে করে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে বেশ উঁচু পর্যায়ে আছে, যদিও গত মাসে সামান্য একটু কমেছিল। এখন মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেবে।

‘বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে সেচ ব্যাহত হবে। তাতে খাদ্য উৎপাদন কমবে। এমনিতে আমন সংগ্রহের জন্য আবহাওয়া পরিস্থিতি খুব একটা সন্তোষজনক নয়। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষি খাতের উৎপাদন আরও ব্যাহত হবে। এতে খাদ্য আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতিই বড় শঙ্কা। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দরিদ্রসীমার নিচে লোকের সংখ্যা বেড়ে যাবে’ বলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

একবার যে হারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে তা যুক্তিসঙ্গত কি? এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে তো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমতির দিকে রয়েছে, কাজেই এই টাইমিংটা (সময়) সঠিক কি না, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমাদের দেশে আরেকটা জিনিস হলো দাম বাড়ানো হলে, তারপর বিশ্ববাজারে যখন দাম কমে তখন সমন্বয় করে কমানো হয় না সাধারণত। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের কোনো উপায় ছিল না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে। পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রাথমিকভাবে অর্থনীতি চাপে পড়বে। কিন্তু রিকোভারির পথটা তৈরি হবে। আমি বলবো এটা একটা ভালো দিক। ইমিডিয়েট ইমপ্যাক্ট নেগেটিভ, কিন্তু এক বছরের মধ্যে এটার পজিটিভ ইমপ্যাক্ট আমরা দেখতে পারবো। ব্যালেন্স অব পেমেন্টে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তা কমে আসবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হবে।

তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। আমরা আসলে আর্টিফিশিয়াল (কৃত্রিম) ভাবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রেখেছিলাম। পৃথিবীর সব দেশেই যখন জ্বালানি তেল ছিল মূল্যস্ফীতির মূল কারণ, আমাদের সরকার গত ছয় মাস সেটা হতে দেয়নি। এখন সেটার খেসারত দিতে হবে। সব থেকে বেশি প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। তবে দাম না বাড়িয়ে সরকারের উপায় ছিল না। সরকার দাম না বাড়ানোর বিষয়টি ছয় মাস ঠেকিয়ে রেখেছিল। আর ঠেকেয়ি রাখার উপায় ছিল না। এখন এটা (জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো) করায় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা একটু শক্তিশালী হবে। কারণ আমদানি কমবে কিছুটা। জ্বালানির ওপর ভর্তুকি কমে যাবে। সরকারের বাজেটটা ব্যালেন্স হবে। এগুলো কাজে লাগবে।

এ সময় তেলের দাম বাজারভিত্তিক করে দেওয়ার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, যে জিনিসটা সরকারের করা উচিত ছিল, সেটা হলো এখন তেলের দাম বাজারভিত্তিক করে দেওয়া। বাজারের সঙ্গে তেলের দাম ওঠা-নামা করবে। এটা বাজারভিত্তিক করে দিলে বিশ্ববাজারে দাম কমলে তার সুফল ভোক্তারা পাবেন, না হলে ভোক্তারা তার সুফল পাবেন না। সেই সঙ্গে জ্বালানি তেলের বিতরণ ব্যবস্থার চুরিচামারি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তি খাতকে এখানে নিয়ে আসতে হবে। সরকার এককভাবে তেল না এনে আরও দুটি কোম্পানিকে দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কৃষিতে বেশিরভাগ পাম্প এখন ইলেক্ট্রিক হয়ে গেছে। হয়তো আগামীতে আরও ইলেক্ট্রিক হবে। কৃষিতে সরকারের যেটা করা উচিত, সেটা হলো সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আসা। পাওয়ার পাম্পগুলো সোলার প্যানেল দিয়ে চালাতে হবে। এটার উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, এ উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। বছরে ৫০ হাজার করে করলে হবে না, আমাদের তো লাখ লাখ সেচ পাম্প আছে। লাখ লাখ সেচ পাম্পকে এখন বিদ্যুৎ থেকে সোলারে নিতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তা, উদ্যোক্তা, উৎপাদক সবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটা ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলবে এমন একটা সময়ে, যখন ভোক্তা এমনিতেই একটা মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। এরকম একটি অবস্থায় এটি (জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো) তার ওপর চাপ আরও বাড়বে। বৈশ্বিক বিভিন্ন কারণে উৎপাদক ও বিনিয়োগকারীর ব্যয় বেড়েছে। এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি আরও বলেন, গ্রাজুয়েলি মার্কেট ম্যাকানিজমের দিকে আমাদের চলে যেতে হবে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতির নিরিখে ভোক্তা, উদ্যোক্তা, উৎপাদকের ওপর একটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। ক্রমন্বয়ে আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে যেতে হবে। যখন দাম বাড়বে, তখন বাড়বে। আবার যখন কমবে তখন সেটার সুযোগও যাতে ভোক্তারা নিতে পারে, এদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। মধ্য মেয়াদে আমাদের এই যে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কৌশল, এটা থেকে নিজস্ব এক্সপ্লোরেশন এবং সেখানে বিনিয়োগ করা, সেটার দিকে আমাদের যেতে হবে।

এদিকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঘাটতি, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির বাড়তি চাপ। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলবে, না কি সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনীয় নয়। এটা আমাদের ভর্তুকির চাপ কমানোর জন্য এক ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করছে। কিন্তু এই ব্যবস্থাপনা ভোক্তা এবং উৎপাদকের স্বার্থের অনুকূলে যাচ্ছে না।

‘আমার মনে হয় আমাদের রপ্তানি, রেমিট্যান্সের যে প্রবণতা দেখছি এবং আমদানি কিছুটা কমা শুরু করেছে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও মূল্য কমছে। তিন-চার মাস পরে বৈদেশিক মুদ্রার যে চাপ আমাদের রিজার্ভের ওপর হয়েছে, সেটা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু এখন যে সমাধানটা করা হলো এটা সাধারণ মানুষ, নিম্ন আয়ের মানুষ, ভোক্তা, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী সবার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমদানি শুল্ক কিছুটা সমন্বয় করেও এতো বড় চাপ না দিলে ভালো হতো’ বলেন এই অর্থনীতিবিদ।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময় দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সঠিক হলো কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা কিছুটা নিচের দিকে প্রবণতা দেখছি। কিন্তু যেই দামে এই মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল, সেখান থেকে বেশি আছে। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা হয়তো সম্ভব ছিল। তখন বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করলে আমার মনে হয় সামষ্টিক অর্থনীতির দিক থেকে বেটার হতো।