বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ভ্রাম্যমাণ রেল জাদুঘর ও ৪৬টি রেল ইঞ্জিন উদ্বোধন

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: শেখ মুজিব ভ্রাম্যমাণ রেল জাদুঘর এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সংগ্রহ করা ৪৬টি রেল ইঞ্জিনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি বাঁশি বাজিয়ে ও পতাকা তুলে নতুন ৩০টি মিটারগেজ ও ১৬টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন উদ্বোধন করেন।

বুধবার (২৭ এপ্রিল) বঙ্গবন্ধু গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি এ উন্নয়ন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে আমাদের আর ক’দিন পরেই ঈদ। ঈদে মানুষের চলাচল আরও বাড়বে। সেই ক্ষেত্রে আমি মনে করি আজকে যে নতুন লোকেমেটিভ (ইঞ্জিন) চালু হচ্ছে, তাতে আমাদের দেশের মানুষ আরও ভালোভাবে ঈদের উৎসবে যোগ দিতে পারবে। নিজের আপন ঘরে ফিরতে পারবে। সেই সুবিধাটা হবে।”

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাস থেকেই জাতির পিতার নামটা সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ ছিল, বাজানো যেত না। “জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া যেত না। তার ছবিটাও দেখানো যেত না। এমনই একটা পরিবেশ ছিল। কিন্তু ইতিহাস আপন গতিতে ফিরে আসে। ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারে না। সেটা আজ প্রমাণিত হয়েছে।

ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরের মাধ্যমে দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ও কর্ম, বাংলাদেশের অভ্যুদ্যয়ের ইতিহাস, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ইতিহাস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, একটি মিটারগেজ ও একটি ব্রডগেজ রেল কোচের ভেতরে প্রস্তুত করা হয়েছে দেশের প্রথম ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর ‘বঙ্গবন্ধু ভ্রাম্যমাণ রেল জাদুঘর’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তার প্রতি সম্মান জানাতেই ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের বিস্তীর্ণ রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন, জীবনাদর্শ, জাতির জন্য তার অনন্য ত্যাগ ও অবদানকে শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ। বিভিন্ন ছবি, প্রতিকৃতি, ভিডিওসহ ডিজিটাল শিল্পকর্মের মাধ্যমে জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তার কর্মজীবনকে মোট ১২টি ভাগে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে জাদুঘরে। জাদুঘরের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জীবনালেখ্য।

বুধবার (২৭ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, কোচের একপাশের দেয়ালের ছয়টি ভাগে রয়েছে— কিংবদন্তির প্রথম প্রহর, ধ্রুবতারার প্রথম কিরণ, নক্ষত্র হওয়ার পথে, বাংলার মাটি ও ভাষার বঙ্গবন্ধু, ধূমকেতু থেকে নক্ষত্র, মুক্তির স্বপ্নের সূচনা শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর জীবনচরিত।

এখানে তুলে ধরা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর শৈশব থেকে পর্যায়ক্রমে তার ছাত্রজীবন, রাজনীতির হাতেখড়ি, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে গণমানুষের প্রাণের নেতা হয়ে ওঠা, ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবর্ণনীয় নির্যাতন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট, মিথ্যা মামলা ও কারাভোগ, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের ইতিহাস।

অপর পাশের দেয়ালের ছয়টি ভাগে রয়েছে—দুর্বার পথচলা, নিপীড়িতের কাণ্ডারি, এক নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন, মুক্তি, সংগ্রাম আর স্বাধীনতার কথা, স্বপ্নগড়ার দিনগুলো, যে আলো নেভেনি আজও এমন শিরোনামে শিল্প প্রদর্শনী। এতে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও জাতির গৌরবোজ্জ্বল ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের প্রধান নায়ক হিসেবে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর অবদানের তথ্যচিত্র। আলোকোজ্জ্বল, মনোমুগ্ধকর ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চমৎকারভাবে বঙ্গবন্ধুকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জাদুঘরটিতে।

জাদুঘরে কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে বিজয় স্তম্ভ ৭১-এর অবিকল রেপ্লিকাসহ ১৩টি টেবিলে রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জীবনালেখ্য। এতে বঙ্গবন্ধুর আদি পৈত্রিক বাড়ি, ব্যবহৃত চশমা, দলের প্রতীক নৌকা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় তামাক পাইপ আর প্রিয় মুজিব কোট। এছাড়া মুজিব শতবর্ষের লোগো, বঙ্গবন্ধুর লেখা বই, মুজিবনগর স্মৃতিস্তম্ভ, পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধের রেপ্লিকা রয়েছে সেখানে। দেয়ালজুড়ে টাঙানো হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ও রাজনীতিক জীবনের ২৪টি দুর্লভ ছবি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে এ জাদুঘর সম্বলিত কোচের এক প্রান্তে রাখা হয়েছে একটি কেন্দ্রীয় এলইডি মনিটর। যেখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা গানের ওপর জাদুঘরের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে একটি মনোমুগ্ধকর থিম সং। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলায় দেওয়া ভাষণ দেখা যাবে ও শোনা যাবে চারটি সাউন্ড বক্সের মাধ্যমে।

শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের দেয়ালজুড়ে রয়েছে ১২টি এলইডি মনিটর, যার প্রতিটিতে সমৃদ্ধ ভিডিও ও স্থিরচিত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জীবনালেখ্য তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে শিমুল মোস্তফার কণ্ঠে প্রতিটি ভাগে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। চাইলেই হেডফোন ব্যবহার করে প্রতিটি পর্বের বর্ণনা শুনতে পারবেন দর্শনার্থীরা। তবে মিটারগেজ রেলকোচ ছোট হওয়ায় এতে ছোট এলইডি রাখা হয়েছে ১০টি। আর অবিকল রেপ্লিকার জন্য টেবিল রাখা হয়েছে ১২টি। বাকি সব ব্রডগেজ রেলকোচের মতো একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে মিটারগেজ কোচটিতে।

অগ্নিনির্বাপণের জন্য ভ্রাম্যমাণ এ জাদুঘরে রয়েছে দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। ভেতরের নিরাপত্তার জন্য দুটি সিসি ক্যামেরা রাখা হয়েছে। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সংযোগ ঠিক রাখতে রাখা হয়েছে আইপিএস সুবিধাও। কোচটি বিভিন্ন স্টেশনে গেলে সেখানে যেন বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া যায়, সেজন্য কোচ বা বগির বাইরের অংশে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থাও থাকবে।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাঙালি জাতির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার স্বাদ ও নতুন বাংলাদেশের নানা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে জাদুঘরটিতে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণসহ চিত্রিত হয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বাঙালির ইতিহাসের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।

শীততাপ নিয়ন্ত্রিত জাদুঘরটিতে রয়েছে জয় বাংলা স্লোগানের আদলে তৈরি করা সৃজনশীল একটি বুক শেল্ফ। যেখানে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘আমার দেখা নয়া চীন’সহ তার কর্মজীবনের ওপর রচিত গুরুত্বপূর্ণ বই। রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শেখ হাসিনার লেখা বই ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’।

‘জয় বাংলা’ বুক শেল্ফে ৮০-১০০টি বইয়ের মধ্যে রয়েছে শিশুদের জন্য বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত বিভিন্ন শিশুতোষ বই। ‘যাদু মনি’ সম্বোধন করে মেয়ে হাসুকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠিসহ তিনটি করে মোট ছয়টি চিঠি রয়েছে এখানে, যা বঙ্গবন্ধুকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে দর্শনার্থীদের।

জাদুঘরটি দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে। দর্শকের নজর কাড়তে ভেতরেই তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ফুলের বাগান। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরের বহিরাবরণ সজ্জিত হয়েছে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ধারাবাহিক সংগ্রামের ওপর শিল্পীর আঁকা রঙিন ম্যুরাল চিত্রের মাধ্যমে।

রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরটি নির্ধারিত স্টেশনে দু-তিনদিন রেখে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকবে। জাদুঘরটি কোনো স্টেশনে যাওয়ার আগে ওই এলাকায় এ নিয়ে চলবে প্রচারণা। যার মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে জাতির জনকের ইতিহাস। বছরভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় তা বাস্তবায়িত হবে দেশজুড়ে। দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ পৌঁছে দেওয়াই এ জাদুঘর বানানোর অন্যতম উদ্দেশ্য।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন, রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. হুমায়ুন কবীরসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।