‘নতুন ভোটারদের মধ্যে অনীহা ও ভীতি জন্মেছে’

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অস্বচ্ছ করার জন্য যদি ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট করা হয়, তাহলে সেই নির্বাচনই ব্ল্যাক আউট (বন্ধ) করে দেওয়া হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল।

বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে সংলাপের একপর্যায়ে সিইসি এসব কথা বলেন। এ সংলাপে দেশের ৩২ নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এতে অংশ নেন ২০ জন প্রতিনিধি।

সংলাপে পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। মুভ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাইফুল হক নির্বাচনের সময় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ না করার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, বিগত কয়েক নির্বাচনে ভোট না দিতে পারার কারণে নতুন ভোটারদের মধ্যে অনীহা ও ভীতি জন্মেছে। তাই নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহী করতে দেশব্যাপী ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি করা যেতে পারে।

তার ওই বক্তব্যের রেশ ধরে সিইসি বলেন, নির্বাচনকে অস্বচ্ছ করার জন্যই যদি কোনো ব্ল্যাক আউট করা হয়, তাহলে আমরা নির্বাচন ব্ল্যাক আউট করে দিতে পারি-এমন পদক্ষেপ হয়তো আমাদের নিতে হবে। আমরা হয়তো নির্বাচন ব্ল্যাক আউট করে দেব। আমরা স্পষ্ট করে বলছি, নির্বাচন স্বচ্ছ হতে হবে। নির্বাচন নিয়ে কূটকৌশল কেউ করতে পারবেন না। নির্বাচনকে আড়াল করার জন্য কেউ ব্ল্যাক আউট করলে নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে স্পষ্ট বক্তব্য থাকবে সেটা টলারেট করা হবে না। এটুকু সাহস আমার (সিইসি) ও আমার সহকর্মীদের (নির্বাচন কমিশনারদের) রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সংলাপে ৮ দফা প্রস্তাবনা দেয় মুভ ফাউন্ডেশন

১) নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে ইন্টারনেট বন্ধ (Blackout, Block or Throttle) না করা। এটি মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২০নং ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, এবং এ ব্যাপারে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির ২০২০ সালের ১২৯ নং সভার সিদ্ধান্ত আছে। পর্যবেক্ষণের সুবিধা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত রাখতে কোনো গণতান্ত্রিক দেশই ইন্টারনেট বন্ধ রাখে না। ২০২১ সালে পৃথিবীর মাত্র ৪টি দেশ, যথাক্রমে – নাইজার, রিপাবলিক অফ কঙ্গো, উগান্ডা, এবং জাম্বিয়া নির্বাচনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছিলো – যেগুলো স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত।

২) বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া অনেকটাই বিদেশি সহায়তা নির্ভর। এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে কমিশনের নিজস্ব তহবিল থেকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে পর্যবেক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এতে কমিশনের সঙ্গে সংস্থাগুলোর কাজের যেমন সমন্বয় হবে, তেমনি নির্বাচনে কথিত বিদেশী হস্তক্ষেপ বা সংস্থাগুলোর বাইরের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক উঠার পথও বন্ধ হবে। পূর্বে কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় বিষয়টি উঠে এলেও এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

৩) অনেক ক্ষেত্রেই নির্বাচনের আগের দিন রাতেও পর্যবেক্ষক পরিচয়পত্র ও যানবাহনের স্টিকার প্রদান করা হয়। ফলে সময়মতো পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা ও কর্ম পরিকল্পনা ঠিক রাখা দুরূহ হয়ে পড়ে। এজন্য নির্বাচনের কমপক্ষে ৭ দিন আগে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তাব করা হয়।

৪) কেন্দ্র ও বুথে বহিরাগত ও সন্ত্রাসীদের চলাচল অবাধ হলেও পর্যবেক্ষকদের গমন ও কাজের ক্ষেত্রে প্রায়শই বাধা প্রদান করা হয়। অথচ আইনে পর্যবেক্ষকদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কাম্য। সেইসঙ্গে আইনের ব্যত্যয় ঘটলে তাৎক্ষনিক শাস্তি প্রদানের নিয়ম করার প্রস্তাব করা হয়

৫) সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা এবং হলফনামায় প্রার্থীদের এ সংশ্লিষ্ট তথ্য যুক্ত করার বিধান রাখার ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

৬) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে যেসব অগণতান্ত্রিক ধারা আইনে আছে (যেমন–নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের স্বাক্ষর), সেগুলো রদ করে প্রার্থীতার পথ উন্মুক্ত রাখা যাতে দলীয় বৃত্তের বাইরেও সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এতে ভোটারদের পছন্দমতো জনপ্রতিনিধি বাছাই করার আরও বিকল্প সৃষ্টি হবে।

৭) বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার কারণে নতুন ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের অনীহা ও ভীতি জন্মেছে। তাই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও তরুণদেরকে আগ্রহী করতে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর সহায়তায় দেশব্যাপী ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করা যেতে পারে।

৮) নিজেদের ইমেজ ও আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে কমিশনের বিতর্কিত কিছু বিষয় (যেমন–কাকে নির্বাচনে আনতে হবে, কার ইভিএম লাগবে ইত্যাদি) পরিহার করে সুচিন্তিত বক্তব্য প্রদান করা সমীচীন। আমরা মনে করি এগুলো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছেই ছেড়ে দেওয়া উচিত এবং তাদের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত হবে, আবার নির্বাচনের মান ও প্রক্রিয়া নিয়েও জনমানসে ধোঁয়াশা তৈরি হবে না।