জীবাশ্ম জ্বালানি নয়, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারেই ভালো থাকবে পৃথিবী

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে ভালো কোনো খবর খুঁজে পাওয়া যেন একপ্রকার দুষ্করই হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর এ গুরুতর ক্ষতির জন্য উন্নত-ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিসঃরণকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হলেও, জলবায়ুর উন্নয়নে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো তারাই বারবার ভেঙেছে। তাদের কারণেই জলবায়ু সংস্কারে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানো এখনো সম্ভব হয়নি।

তবে এবার মিশরের শারম এল-শেইখ শহরে আয়োজিত কপ-২৭ সম্মেলনে বিশ্বের ধনী দেশগুলো স্বস্তির সংবাদ দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, শিল্পোৎপাদন থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান নির্গমন কমাতে তাদের পক্ষ থেকে যথোপযুক্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি উন্নত দেশ কার্বন নিঃসরণের মাত্রা আশানুরূপভাবে কমিয়ে এনেছে ও তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

তিন শতাব্দী বা তারও বেশি সময় ধরে শিল্পোৎপাদনে জীবাশ্ম-জ্বালানির ব্যবহার হয়ে আসছে। ক্রমেই এ ব্যবহার বেড়েছে, যার ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর মারাত্মক বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে।

দ্য ইকনোমিস্ট বলছে, কয়লা-তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার আন্তর্জাতিক উৎপাদন, উন্নতি ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রাও।

কার্বন নিঃসরণ ও জলবায়ুর এ সম্পর্কের কারণেই উন্নত দেশের কতিপয় পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধের বিষয়ে একমত হয়েছে। তাদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়নের গতি কমিয়ে, নবায়নযোগ্য সবুজ শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাবগুলো থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।

দ্য ইকনোমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বা কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর পরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের ৩৩টি দেশ ভালো পরিমাণ জিডিপি অর্জন করেছে।

এ ধরনের পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কারণ, উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের বদলে সবুজ শক্তি ব্যবহার করে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে।

২০০৭ সালের পর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কার্বন ডাইঅক্সাইড ‍উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার ১৩০ কোটি টন কমিয়ে এনেছে। করোনা মহামারীর আগে এ হ্রাসের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ২৬০ কোটি টন।

আশ্চর্যজনক হলেও, দেশটির বেসামরিক নাগরিকদের বাসা-বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ১৫ শতাংশ কমার ফলেই সামগ্রিক নিসঃরণের পরিমাণ কমেছে।

মূলত ‍দুটি বড় পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বা উৎপাদনের সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির সম্পর্ক কমছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অবকাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে। দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশগুলো এখন পরিবেশবান্ধব আমদানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

দেখা যায়, যে দেশ যত ধনী হচ্ছে, সে দেশ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কম জ্বালানিশক্তির প্রয়োজন হয় এমন সেবাখাতগুলো সম্প্রসারিত করছে। শিল্প বিপ্লবের জন্মস্থান যুক্তরাজ্যে জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনের থেকে মানবনির্ভর উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। এমনকি শিল্প দক্ষতার জন্য বিখ্যাত জার্মানিতেও জ্বালানি কিংবা প্রযুক্তি নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা সংকুচিত করা হচ্ছে।

এদিকে, চীনের মতো বড় অর্থনীতির দেশ এখন পরিবেশবান্ধব আমদানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। চীনের রপ্তানি খাত দেশটির অন্য যেকোনো অর্থনৈতিক খাতের তুলনায় কার্বনের ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে এনেছে। চীনের এমন পদক্ষেপ ধনী দেশগুলোকেও কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাধ্য করেছে।

এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য শক্তি ও বৃহত্তর বিদ্যুতায়নে বিনিয়োগকারীদের ধন্যবাদ দেওয়া যেতেই পারে। এ ধরনের বিনিয়োগে বিশ্ব ভালো থাকবে। এমনকি, এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পোৎপাদনের সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। তবে, দরিদ্র দেশুগুলো এ নীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকায় বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের গতি কমছে না।

উৎপাদনে জ্বালানিনির্ভরতা যদি কমানো যায় তাহলে, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জীবনযাত্রার মানেই উন্নত হবে না, বরং দরিদ্র দেশগুলো ধনী হওয়ার জন্য বৈশ্বিক কার্বন বাজেটের বেশি অংশ ব্যবহার করতে পারবে।

অনেকের মতে, যেসব দেশে সবুজ শক্তির পরিমাণ বেশি ও সস্তা, তারা সবুজ শক্তি ব্যবহার করতে চায় না বা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে চায় এমন দেশের থেকে অনেক প্রগতিশীল।

তবে কিছু পরিবেশবাদীরা বলতে পারেন, শিল্পোৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনার একটি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। কারণ, অনেকে মনে করতে পারেন- উৎপাদনে সবুজ শক্তি ব্যবহার করলেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মানবজাতিকে আর লড়াই করতে হবে না।