কোভিড, অর্থনৈতিক মন্দায়ও যেভাবে বাড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসার বিনিয়োগ

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: কোভিডকালীন চাকরি হারিয়ে অনেকেই ছোট ব্যবসায়ে নতুন বিনিয়োগ করেছেন। আবার অনেক ছোট ব্যবসা বন্ধও হয়ে গেছে। অনেকে আবার ব্যবসা পরিবর্তনও করেছেন।

একটি বেসরকারি কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগে রাজধানীতে সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ (এসআর) হিসেবে কাজ করতেন বগুড়ার সিরাজুল ইসলাম। বেতন ও সেলস কমিশন মিলে প্রতিমাসে ভালোই ইনকাম ছিল। কিন্তু কোভিডের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানির অবস্থা খারাপ হলে, ২০২০ সালে মার্চ মাসে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

চাকরি হারানোর পর দুইমাস ঢাকায় অবস্থান করে অন্য কোম্পানিতে চাকরি খুঁজেও ব্যর্থ হন সিরাজুল। এরপর সিদ্ধান্ত নেন গ্রামে চলে যাওয়ার।

২০২০ সালের জুন মাসে গ্রামে চলে যাওয়ার পর জীবিক নির্বাহের জন্য গ্রামের বাজারেই ছোট একটি ফার্মেসি দেন সিরাজুল। চাকরিকালে জমানো ৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে খুচরা ওষুধ বিক্রির এই দোকান দেন তিনি।

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার সাহারবাজার নামের ওই বাজারে শুধু সিরাজুল নয়, কোভিডকালে তার মতো চাকরি হারানো আরো চারজন বিভিন্ন ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন বলে জানান তিনি।

চারজনের মধ্যে একজন মোবাইল একসেসরিজ ও পার্টসের দোকান, একজন মোবাইল আর্থিক সেবার দোকান, একজন ফল বিক্রির দোকান দিয়েছেন এবং আরেকজন দিয়েছেন ব্যাটারি চালিত রিকশার পার্টসের দোকান।

কোভিডকালীন চাকরি হারানোর পর এরকম অনেকেই ছোট ব্যবসায়ে নতুন বিনিয়োগ করেছেন। আবার অনেক ছোট ব্যবসা বন্ধও হয়ে গেছে। অনেকে আবার ব্যবসা পরিবর্তনও করেছেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সুত্রে জানা যায়, আইন অনুযায়ী এরকম ছোট-বড় ২৯৪ ক্যাটাগরির ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইন্সে নেওয়া বাধ্যতামূলক। ব্যবসা করতে হলে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। এছাড়াও প্রতিবছর এসব ব্যবসার উপার্জন থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ করে লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে কোভিড চলাকালে গত তিন বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ধরনের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ে বিনিয়োগ বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ছোট-খাটো এসব ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইন্স নেওয়ার জন্য ফি, নবায়ন ফি এবং নবায়নের আয়কর রিটার্ন ও মূল্য সংযোজন কর প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে গত তিন বছর এই বৃদ্ধির পরিমাণটা উল্লেখযোগ্য।”

যে কারণে বাড়ছে ব্যবসা

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেন, কোভিড চলাকালীন অনেক কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান ও কারখানার ব্যবসা এবং উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জনবলের একটি বড় অংশ ছাটাই হয়েছে।

“তাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে চকারি পরিবর্তনের সুযোগ হয়তো পেয়েছেন। আবার অনেকেই গ্রামে গিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন,” বলেন তিনি।

আইএলও এর স্টাডি তুলে ধরে আহসান এইচ মনসুর বলেন, কোভিডকালে তিন বছর বাংলাদেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষ চাকরি ও পেশা হারিয়েছে। তাদের মধ্যে একটি ছোট অংশ হয়তো এসব ব্যবসা শুরু করেছে।

আবার অনেকেই কোভিডের ধাক্কা সামাল দিতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। এজন্যই গত তিন বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যবসা বন্ধও হয়েছে।

২০১৪ সালে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশে একটি রেস্টুরেন্ট দেন মহসিন মিয়া। কোভিড শুরু হলে ব্যবসার অবস্থা খারাপ হওয়ায় রেস্টুরেন্টটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি।

মহসিন মিয়া বলেন, “কোভিড শুরুর আগে ২৫ জন কর্মচারী ছিল। প্রতিদিনের বিক্রয় ছিল লাখ টাকার বেশি, কিন্তু কোভিড শুরুর পর সব শ্রমিক গ্রামে চলে যায়। এছাড়া, হঠাৎ করে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না। ফলে আর ব্যবসা পুনরায় চালু করতে পারিনি।”

শুধু কোভিডের কারণেই ছোট বিনিয়োগ বাড়ছে না

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, দেশে প্রায় ৩ লাখ পাবলিক ও প্রাইভেট কোম্পানি রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

“দেশের সব জায়গায় এখন উন্নয়নের ছোঁয়া। এখন শহরের মানুষের মতো গ্রামের মানুষও নাগরিক সুবিধা পাচ্ছে। এছাড়া, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় কানেকটিভিটিও বৃদ্ধি পাচ্ছে,” বলেন তিনি।

সাবেক এই গভর্নর আরও বলেন, একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় অনেক ধরনের পণ্যদ্রব্য কেনার জন্য জেলা বা উপজেলা শহরই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু যোগাযোগ বাড়ার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও অনেক কিছুই এখন সহজে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে এসব পণ্যদ্রব্য বিপণনের জন্য পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বিশ্বায়নের প্রভাবে স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের ব্যবসা বাড়ছে।

বিবিএসের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দেশে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ের প্রায় ২৫ লাখ ৪১ হাজার ছোট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোতে মোট নিয়োজিত ব্যক্তি ২০০৯ সালের ৫২ লাখ ৬৫ হাজার জন থেকে বেড়ে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ এসে দাঁড়ায় ৯১ লাখ ৯৫ হাজার জনে।

গড় নিয়োজিত জনবলের আকারও ২০০৯ সালের ১.৯৯ থেকে ২০২১ সালে ৩.৬২ জনে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা ৫১ লাখ ৭৫ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯ লাখ ৯২ হাজার। বাংলাদেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে এই পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ(এফবিসিসিআই)-এর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, এই হিসাবটি করা হচ্ছে শুধু ট্রেড লাইসেন্স ধরে। ট্রেড লাইসেন্সের বাইরেও অনেক ধরনের ব্যবসা আছে, যেগুলো হিসাবে আসছে না।

“আমরা বলতে পারি, আমদানি-রপ্তানি নির্ভর ব্যবসাসহ বড় ধরনের ব্যবসাগুলো প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী ছোট ব্যবসাও বৃদ্ধি পাচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।