কোটি টাকার সড়কে অবৈধ বাজার

বায়েজিদ বাংলাবাজার মোড়।
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বায়েজিদ বাংলাবাজার মোড় সড়ক কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে সড়কটি নির্মাণ করা হলেও সেখানে যানবাহন চলাচল করতে পারে না। পুরো সড়ক দখল করে বসানো হয়েছে ভ্যান গাড়ির ভাসমান অবৈধ বাজার। আর এ অবৈধ ভাসমান বাজার থেকে মাসে চাঁদা তোলা হয় সাড়ে চার লাখ টাকা। প্রতিটি ভ্যান বসানোর শুরুতে নেয়া হয় পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা। এছাড়া ভ্যানে সংযোগ দেয়া বিদ্যুতের বাল্বপ্রতি দৈনিক বিল নেয়া হয় ২০ টাকা। বাজারে ৫ শতাধিক বাল্ব রয়েছে। সেই হিসাবে মাসে ৩ লক্ষাধিক টাকার চাঁদা তোলা হয় বিদ্যুৎ খাতে।

জানতে চাইলে বিদ্যুতের খুলশীর (বিক্রয় ও বিতরণ) নির্বাহী প্রকৌশলী শাহ রেওয়াজ জানান, প্রায় সময় আমরা সেখান থেকে বাল্ব খুলে নিয়ে আসি। অনেক দোকানদার আছেন সংযোগ দিয়ে টাকা নেন। প্রতিদিন অভিযান চালানো অনেকটা কঠিন। বিদ্যুতের এ কর্মকর্তা বলেন, প্রশ্ন হচ্ছে সড়কের উপর অবৈধ বাজার বসে কিভাবে তা আমি বুঝতে পারি না।

জানা যায়, অবৈধ এ বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন জসিম উদ্দিন পাটোয়ারী ওরফে পানি জসিম, জিয়া, জাবেদ ও পুলিশের বউ খ্যাত জান্নাত বেগম নামে তিন ব্যক্তি। বছরের পর বছর ধরে বাংলাবাজার মোড়ে সড়ক দখল করে অবৈধ ভাসমান হকার বসিয়ে চাঁদাবাজি চললেও থানা পুলিশ কিংবা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব। সড়ক ও ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং দখলমুক্ত করতে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ বা বিশেষ দল মাঠে নামিয়েছে সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। গত দুইমাস ধরে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযান চালালেও চসিকের ‘স্ট্রাইকিং ফোর্সের’ পা পড়েনি বাংলাবাজারে। তবে চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাশেম জানান, তারা শীঘ্রই বাংলা বাজারে উচ্ছেদ অভিযান চালাবে।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন বাংলাবাজারে পরিদর্শনে দেখা যায়, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সড়কের প্রবেশমুখ থেকে বাংলাবাজার মোড়ে সড়কজুড়ে বসানো হয়েছে বড় আকারের নানা রংয়ের ছাতা। প্রথম দেখাতেই মনে হবে সেখানে হয়তো কোন মেলা বসেছে। কাছে গেলে দেখা যায় প্রতিটি ছাতার নিচে রয়েছে একটি ভ্যান। কোনটিতে নানা পদের সবজি, কোনটিতে কাঁচা মাছ আবার কোনটিতে মুরগি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যক্তি জানান, দেখতে স্থায়ী মনে হলেও সড়কজুড়ে বসানো হয়েছে অবৈধ বাজার। প্রতিটি ভ্যান থেকে দিনে ৫০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। প্রায় ২৫০টি ভ্যান রয়েছে। দিনে ১২ হাজার ৫’শ টাকা করে মাসে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়। একটি ভ্যান বসাতে প্রথমে নেয়া হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা।

জসিম ওরফে পানি জসিম নামে এক ব্যক্তি অবৈধ এ বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করেন। দিনে এবং রাতে টহল পুলিশের দুটি গাড়িতে আসা পুলিশকে দেয়া হয় এক হাজার করে দুই হাজার টাকা। বাকি টাকা জসিম ও তার অনুসারী জিয়া এবং জাবেদ ভাগভাটোয়ারা করে।

বায়েজিদ থানার পরিদর্শক (ওসি) ফেরদৌস জাহানা জানান, এ ধরনের ঘটনার সাথে পুলিশের নূন্যতম কোন সম্পর্ক নেই। বাংলাবাজারে চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েক দিন আগে মানিক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। বাংলাবাজার নিয়ে আমি খুবই সমস্যায় আছি। সড়কটি সিটি কর্পোরেশনের। এতবড় একটি অবৈধ বাজার সেখানে বসেছে। অথচ সিটি কর্পোরেশন কোন ভূমিকা রাখছে না।

ওসি ফেরদৌস বলেন, আমার থানার কোন টহল পুলিশ যদি সেখান থেকে কোন ধরনের চাঁদা তোলে এমন প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাবাজারে যারা অবৈধ হকার বসিয়েছে তাদের সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী। সেখানে হাত দিতে গেলেই পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে বসে। যেমন, রুবেল নামে এক ব্যক্তি একাধিক মামলার আসামি। তিনিও আমার পূর্ববর্তী ওসির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। আমি প্রতিদিন টহল পুলিশ দিয়ে সড়কটি কোনমতে গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাখি। সিটি কর্পোরেশন না চাইলে অবৈধ এ বাজার কোনভাবেই উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। সকালে হকারমুক্ত করলেই বিকেলে আবার সড়ক দখল করে হকাররা।

চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবুল হাশেম জানান, বাংলাবাজার মোড়ে সড়কের বাজারটি অবৈধ। আমরা সেখানে শীঘ্রই বড় আকারের অভিযান চালাবো। অবৈধ এ বাজার উচ্ছেদ করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে জসিম উদ্দিন জানান, আমার পেছনে শত্রু লেগেছে। ২০১৯ সালে বাংলাবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে মারামারি হওয়ার পর আমি এসব ছেড়ে দিয়েছি। এখন আমি হকারের কাছ থেকে চাঁদা তুলি না। জিয়ার চাঁদা তোলা প্রসঙ্গে জসিম জানান, জিয়া চাঁদা তুলে এমন কথা আমিও শুনেছি। তবে জিয়া জানান, আমি নই। জসিম, জাবেদ ওরা বাংলাবাজারের হকারের কাছ থেকে চাঁদা তোলে। প্রতি ভ্যানগাড়ি থেকে দিনে ৫০ টাকা এবং একটি সবজির ভ্যান বসাতে শুরুতে ৫ থেকে ১০ হাজার (স্থানভেদে) এককালীন টাকা নেয়।

এছাড়াও ভ্যানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার জন্য বাল্বপ্রতি দৈনিক বিল নেয়া হয় ২০ টাকা হারে। বাজারে ৫ শতাধিক বাল্ব রয়েছে। সেই হিসাবে দিনে ১০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। মাসে দাঁড়ায় ৩ লাখ টাকা। বিদ্যুতের টাকা উত্তোলন করেন এক আ. লীগ নেতার তত্ত্বাবধায়ক অপু।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ১৩ মে বায়েজিদ বাংলাবাজার এলাকায় সড়ক দখলমুক্ত ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় জসিম ও তার অনুসারীরা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আক্তারের জিপসহ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে। সেই সময় বায়েজিদ বোস্তামী থানার এএসআই মুজিবুর রহমান, নায়েক নাছির, কনস্টেবল কায়েস ও রাজ্জাক আহত হন। একসময় জসিম ছাত্রদল করলেও বর্তমানে নিজেকে যুবলীগ হিসাবে পরিচয় দেন। ম্যাজিস্ট্রেটের উপর হামলা চালানোর অপরাধে সেই সময় জসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।