কক্সবাজারে আবাসস্থল ধ্বংস, দুই বছরে ১৩ হাতির অস্বাভাবিক মৃত্যু

CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV

কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, রোহিঙ্গা ও হাতির অভয়ারণ্য ধ্বংসের কারণে একের পর এক বন্যহাতির অস্বাভাবিক মৃত্যু হচ্ছে।

শুধু চলতি মাসেই কক্সবাজার জেলায় ৩টি হাতি মারা গেছে। এ নিয়ে গত দুই বছরে মারা গেছে ১৩টি এশিয়ান বন্যহাতি।

এ নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে হাতির আবাসস্থল উজাড়, চলাচলের করিডরে চরমভাবে বাধাগ্রস্থ ও খাদ্য সংকটে পড়েছে হাতিরা। প্রায় লোকালয়ে হানা দেয় বন্যহাতির দল। এ কারণে ফসল রক্ষায় বিদ্যুৎ শক ও গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে হাতি।

সারাদেশের মহাবিপন্ন এশিয়ান হাতির ২৬৮টির দুই তৃতীয়াংশের বাস কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে।

কিন্তু কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলে রেললাইন, রোহিঙ্গা বসতি, বিভিন্ন প্রকল্প, অবৈধ জবরদখলসহ বিভিন্ন কারণে এসব হাতির নিরাপদ আবাসস্থল ধ্বংস, পর্যাপ্ত খাদ্যাভাব, চলাচলের করিডর চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হয়েছে। ফলে এসব হাতি লোকালয়ে হানা দিচ্ছে।

গত ৬ নভেম্বর চকরিয়ার খুটাখালী বনাঞ্চলে একটি বাচ্চা হাতিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৬ নভেম্বর রামুর জোয়ারিয়ানালা বনাঞ্চলে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩০ বছর বয়সী স্ত্রী হাতি মারা যায়। আর ১৭ নভেম্বর রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়িতে বিদ্যুত শক ও গুলি করে আরও একটি হাতিকে হত্যা করা হয়। একইভাবে গত দুই বছরে কক্সবাজার ও আশপাশের অঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হয়েছে ১৩টি বন্যহাতির।

কক্সবাজারে একের পর এক এশিয়ান হাতির মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতারা জানান, নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি, খাদ্য সংকট দূর করা, হাতি চলাচলের করিডোর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখা, হাতি হত্যায় জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা, মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, বনভূমি দখল রোধ, বনাঞ্চল তৈরিসহ মহাবিপন্ন এশিয়ান হাতি সুরক্ষায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা নাহলে মানুষের নির্মমতায় দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে পড়বে বন্যহাতি।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, ‘কক্সবাজারে অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। বিশেষ করে রেললাইন ও রোহিঙ্গাদের কারণে বন্যহাতির আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। গভীর বনাঞ্চলেও মানুষেরা অবৈধ দখলে নিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। এতে করে চরম খাদ্য সংকট সৃষ্টি হওয়ায় হাতিগুলো লোকালয়ে মানুষের ফসলে হানা দিচ্ছে এবং মানুষের নির্মমতায় মারা যাচ্ছে এশিয়ান হাতি।’

পরিবেশবাদী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলের প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, ‘কক্সবাজারে একের পর এক বন্যহাতিকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। হাতি ও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। কক্সবাজার অঞ্চলে যেসব বন্যহাতি রয়েছে তারা একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বন্দি হয়ে আছে। হাতির আবাসস্থল দিয়ে অপরিকল্পিত রেললাইন ও রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠায় এ পর্যন্ত ২২টি হাতির করিডোর বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাতিগুলো লোকালয়ে হানা দিচ্ছে এবং এক শ্রেণির দুষ্কৃতিকারিরা হাতিগুলোকে গুলি করে হত্যা করছে। হাতিগুলোকে বাঁচাতে গেলে সরকারকে সঠিক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, ‘কক্সবাজারে বিভিন্ন এলাকায় হাতি সহ বন্যপ্রাণী হত্যার বিষয়টি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন মানব সৃষ্ট কারণে এসব হাতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে অবিরত। ফলে তাদের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। পাহাড় কাটা রোধসহ বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম বা আভাসস্থল রক্ষায় পরিবেশ অধিদফতার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কক্সবাজার বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসে ৩টি বন্যহাতিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দেখা গেছে প্রতিটি হাতিকে ৪-৮টি পর্যন্ত গুলি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ শকের চিহ্নও রয়েছে। ফলে মানুষের এমন নির্মমতায় এশিয়ান হাতি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।