ঈদের পর আরেক দফা বাড়লো নিত্যপণ্যের দাম

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: কয়েকদিন ধরে তেল কিনতে নাজেহাল হচ্ছেন ভোক্তা। সঙ্গে নতুন করে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে পেঁয়াজের দাম। শুধু এই দুটি পণ্য নয়, সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে চাল থেকে শুরু করে ডাল, চিনি, আটা-ময়দা, আদা-রসুন, আলু, সব ধরনের মাংস, ডিম ও গুঁড়াদুধসহ ১০ পণ্যের দাম বেড়েছে আরেক দফা। ফলে এসব পণ্য কিনতে ভোক্তার করুণদশা।

তারা বলছেন, আয় বাড়ছে না বরং ব্যয় প্রতি সপ্তাহেই বাড়ছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যের দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীদের এখন আর কোনো ইস্যু লাগে না। তারা চাইলেই অবৈধ মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, বাড়াচ্ছে দাম। তাই কঠোরভাবে তদারকি না করলে ক্রেতারা কোনো ধরনের সুফল পাবে না।

শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, নয়াবাজার, জিনজিরা বাজার ও মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে বেশ কয়েকটি পণ্যের বাড়তি দর জানা গেছে।

বিক্রেতারা বলছেন, এসব পণ্যের দাম ঈদের পর বেড়েছে। সেগুলোর মধ্যে ঈদের আগে যে মসুর ডাল (ছোট দানা) ১২০ টাকা বিক্রি হয়েছে তা শুক্রবার ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বড় দানার মসুর ডাল কেজিতে ৫-১০ টাকা বেড়ে ১১০-১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি খোলা চিনি মানভেদে ২-৪ টাকা বেড়ে ৮২-৮৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি খোলা আটা ২-৫ টাকা বেড়ে ৪২-৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খোলা ময়দা কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

এছাড়া খুচরা বাজারে প্রতিকেজি আলুর দাম ৫ টাকা বেড়ে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ শুক্রবার ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৩৫ টাকা। আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর প্রতিকেজি দেশি ও আমদানি করা আদা ১০ টাকা বেড়ে ১৫০ ও ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি দেশি রসুন ২০ টাকা বেড়ে ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

দাম বাড়ার তালিকায় শুকনা মরিচও যোগ হয়েছে। কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছে ২২০-২৪০ টাকা। বাজারে নতুন করে মুরগি ও গরুর মাংসের দামও বেড়েছে। কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগির দাম এখন ১৮০ টাকা। ঈদের আগে ৭০০ টাকা কেজিদরে প্রতিকেজি গরুর মাংস বিক্রি হলেও এখন সর্বোচ্চ ৭২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে ডিমের দামও বেড়েছে। প্রতি হালি (৪ পিস) ফার্মের ডিম এক সপ্তাহ আগে ৩৬ টাকা বিক্রি হলেও শুক্রবার ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোম্পানিভেদে প্রতিকেজি গুঁড়াদুধ ৬৫০-৬৯০ টাকা বিক্রি হলেও খুচরা বাজার ও পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানে এখন বিক্রি হচ্ছে ৬৯০-৭৫০ টাকা। আর রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি লিটার বোতল সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ২০০-২১০ টাকা।

রাজধানীর নয়াবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা খুরশিদা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজারে এলে কাঁদতে ইচ্ছা হয়। সব ধরনের পণ্যের দাম হু-হু করে বেড়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ এক সপ্তাহের চিত্র প্রত্যেকটি পণ্যে কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে। এমন হলে কীভাবে সংসার চালাব জানি না। এর একটা সমাধান সরকার সংশ্লিষ্টদের বের করতে হবে। কারণ পরিবার নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, পণ্যের দাম কী কারণে বাড়ছে তার সুনির্দিষ্ট কারণ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বের করতে হবে। কোথায় কোথায় অভিযান পরিচালনা করতে হবে তার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি কঠোরভাবে তদারকি না করলে ভোক্তা কখনো সুফল পাবে না।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, সার্বিকভাবে তদারকি করে বাজারে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে অধিদপ্তর ফৌজদারি মামলা করতে পারে না। কারণ তদারকিকালে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট থাকে না। তবে আমাকে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাকে বলা হচ্ছে, কেন শুধু জরিমানা করা হচ্ছে? কেন বিশেষ ব্যবস্থায় মামলা করা হচ্ছে না? আমরা সেই দিকে যাচ্ছি। এবার অনিয়ম রোধে জরিমানার সঙ্গে মামলা দিয়ে অসাধুদের জেলে দেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে তেলের পর এবার পেঁয়াজ নিয়ে চলছে অস্থিরতা। পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে প্রতিদিনই ২-৩ টাকা করে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। গত রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা। ব্যবসায়ীদের দাবি, ইমপোর্ট পারমিটের (আইপি) মেয়াদ শেষ হওয়ায় বন্ধ রয়েছে পেঁয়াজের আমদানি। এ কারণে বাজারে পেঁয়াজ সংকট সৃষ্টি হওয়ায় দাম বাড়ছে।

তবে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) দাবি-পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের কারসাজি। তারা কখনো তেল, কখনো পেঁয়াজ, আবার কখনো আলু কিংবা অন্য পণ্য নিয়ে খেলছে।

মধ্যম চাকতাই এলাকায় অবস্থিত এইচজে ট্রেডার্সের মালিক দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, আইপি বন্ধ থাকায় ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। এ কারণে দাম বাড়ছে। খাতুনগঞ্জে আগে যেখানে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ ট্রাক পেঁয়াজ আসত, বর্তমানে আসছে মাত্র ১০-১৫ ট্রাক করে। সীমান্তের বিভিন্ন গুদামে মজুত থাকা পেঁয়াজ এখন খাতুনগঞ্জে আনা হচ্ছে।

তিনি জানান, গত রোববার খাতুনগঞ্জে ভারতীয় পেঁয়াজ প্রতিকেজি বিক্রি হয় ২৮ থেকে ৩০ টাকায়। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ২৫ থেকে ২৬ টাকায়। গত পাঁচ দিনের ব্যবধানে বৃহস্পতিবার ভারতীয় পেঁয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হয় ৩৮ থেকে ৩৯ টাকায় আর দেশি পেঁয়াজ ৩২ থেকে ৩৩ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

এদিকে পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খুচরা বাজারেও বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। খুচরা বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা ৪২ টাকায়।

চাকতাই-খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাসেম বলেন, আইপির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ভারত থেকে পেঁয়াজ আসছে না। এ কারণে দেশে পেঁয়াজ সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে। বর্তমানে বাজারে দেশি পেঁয়াজের পাশাপাশি আছে ভারতীয় পেঁয়াজ।

তিনি আরও বলেন, ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে না। এখন মিয়ানমার থেকেও পেঁয়াজ আনার কথা চলছে। এ বিষয়ে ১৪ মে ব্যবসায়ীদের বৈঠক রয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হতে পারে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আসবে কিনা।