আমেরিকার সকল বাধার মুখে চিপ শিল্পে চীনের অগ্রগতি

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: আগামীর বিশ্ব তারই নিয়ন্ত্রণে থাকবে, চিপ শিল্পে থাকবে যার আধিপত্য। অর্থনীতি হোক বা সামরিক শক্তির বিকাশ– সেমিকন্ডাক্টর বা কম্পিউটার চিপ সবখানেই অপরিহার্য। কিন্তু, এই খাতটিতে দিন দিন আরও শক্তিশালী চিপ তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে।

এদিক থেকে এগিয়ে রয়েছে আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র) ও তার মিত্ররা। কিন্তু, গুরুত্ব বুঝে চীনও অগ্রসর হতে চাইছে। সেমিকন্ডাক্টরে চীনের এই উত্থান ঠেকাতেই তার প্রতি পদে বাধাবিপত্তির কাঁটা বিছিয়ে দিচ্ছে ওয়াশিংটন। ফলে চীনের জন্য এই প্রচেষ্টা হয়ে উঠছে, খাড়া চড়াই বেয়ে ওঠার মতোই কঠিন।

চীনের সুষ্পষ্ট লক্ষ্য সর্বাধুনিক চিপ উৎপাদন, এবং কৌশলগতভাবে সীমাহীন সম্ভাবনার এই প্রযুক্তিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। তাহলে কম্পিউটিং শক্তিতে দেশটি হবে অপ্রতিরোধ্য; সোলার প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো– এই ক্ষেত্রেও তখন আমেরিকাকে হেরে যেতে হবে চীনের কাছে। অতীতে চীন তার নিজস্ব প্রযুক্তি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে এসব খাতে।

তাই এবার বলতে গেলে কোমর বেঁধে নেমেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রতিষ্ঠান– এনভিডিয়া এবং এএমডির সর্বাধুনিক গ্রাফিক্স প্রসেসর ইউনিট (জিপিইউ) – মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সফটওয়্যার পরিচালনা ও সুপারকম্পিউটার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। গত সপ্তাহে এগুলি চীনের কাছে বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকা।
এর আগে গত মাসে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চীনের কাছে ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) সফটওয়্যার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই সফটওয়্যার মূলত ব্যবহার হয় পরবর্তী প্রজন্মের চিপ উৎপাদনে।

চিপসেট উৎপাদনে অগ্রগামী- আমেরিকার পূর্ব এশীয় তিন মিত্র- তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। দেশগুলিকে আমেরিকার সাথে হাত মিলিয়ে ‘চিপ-৪’ শিল্প জোট গড়ে তোলার তাগিদ দিচ্ছে ওয়াশিংটন, যাতে বৈশ্বিক প্রযুক্তিটির ইকোসিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যায় চীনকে।

একইসঙ্গে, স্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে ‘চিপ অ্যাক্ট’ নামক আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগও নিয়েছে। এজন্য মার্কিন ভূখণ্ডে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলি পাবে ৫২ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি।

দুই পরাশক্তির এখাতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ‘চিপ ওয়ার’ শীর্ষক একটি বই লিখছেন ক্রিস মিলার, অচিরেই এটি প্রকাশিত হবে। ক্রিস আল জাজিরাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমে আমেরিকা তার কেন্দ্রীয় চরিত্র ধরে রাখতে চায়, একইসঙ্গে চীন যেন সর্বাধুনিক চিপ উৎপাদনে সক্ষম না হয়–সেটিও নিশ্চিত করতে চায়’।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘শুধু বিশ্ব অর্থনীতি, স্বচালিত যানবাহন ও ক্লাউড কম্পিউটিং- এর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভবিষ্যৎ আধিপত্য নয়, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে সেই অগ্রসর সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।’

আর সেকারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার ময়দান হয়ে উঠেছে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। আসলে বিশ্ব অর্থনীতিকে চালিত করার প্রাণভোমরা চিপ, অত্যাধুনিক স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ফাইটার জেট নির্মাণ–কোথায় নেই এর ব্যবহার! যার অর্থ দাঁড়ায়, দিনে দিনে পরিসরে ছোট হয়ে আসতে থাকা চিপের ওপরই নিয়ন্ত্রণ করছে বিশ্বমঞ্চে শক্তির ভারসাম্য।

চীনসহ দুনিয়াময় প্রধান প্রধান অর্থনীতিগুলো চিপ সরবরাহ পেতে বিপুলভাবে তাইওয়ানের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে সর্বাধুনিক চিপের ৯০ শতাংশ সরবরাহ করে তাইওয়ান। এই নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে– সাম্প্রতিক সময়ে নিজ ভূখণ্ডে শিল্পটির বিকাশের লক্ষণীয় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে চীন, করেছে তেমন অগ্রগতিও।

গত জুলাইয়ে টেকইনসাইটস সংস্থার গবেষকরা জানান, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত– সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন (এসএমইসি) ৭ ন্যানোমিটার আয়তনের চিপ প্রস্তুতের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে ১৪ ন্যানোমিটার আকারের চিপ প্রস্তুত করেছে চীন, এর চেয়ে ছোট চিপ তৈরিতে তারা হিমশিম খেয়েছে। সাম্প্রতিক অগ্রগতি এদিক থেকে দেশটির জন্য একধাপে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়াই বলা যায়।

সেমিকন্ডাক্টরকে প্রধানত তাদের ট্রানজিটর গেটের দৈর্ঘ্য দিয়ে তুলনা করা হয়। এটি যত ছোট হবে চিপের প্রসেসিং শক্তি হবে ততই বেশি।

চিপ যেখানে প্রস্তুত করা হয়– সেই কারখানাকে বলা হয় ‘ফাউন্ড্রি’। এসএমইসি এখন তাদের ফাউন্ড্রি সক্ষমতাকে প্রসারিত করছে, অচিরেই উত্তরাঞ্চলীয় শহর তিয়ানজিনে চতুর্থ কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে।

এবিষয়ে জানতে এসএমইসির সাথে যোগাযোগ করে আল জাজিরা, কিন্তু তারা এতে সাড়া দেয়নি। চীনের এসএমইসি সাত ন্যানোমিটার আকারের চিপ প্রস্তুতের সক্ষমতা অর্জন করেছে। ছবি: অ্যালি সং/ রয়টার্স

সংশ্লিষ্ট শিল্পের বিশ্লেষক ডিলান প্যাটেল আল জাজিরাকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি বড় বাধা অতিক্রম। কিছু ফিচারে এখনও কমতি থাকলেও, এটি সম্পূর্ণ কার্যকর একটি ব্যবস্থা’।

৭ ন্যানোমিটার চিপ উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘১৪ ন্যানোমিটারের চেয়েও ছোট চিপ প্রস্তুত চীনের সামনে ছিল আপাতদৃষ্টিতে অপ্রতিরোধ্য বাধা। এটিকে অতিক্রম করতে পারাটা তাদের লক্ষণীয় অগ্রগতির উদাহরণ। এখন তাদের নতুন চিপের নকশা উন্নয়নের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের চিপ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে’।

এর আগে মার্কিন চাপের মুখে চীনের কাছে উচ্চমানের চিপ উৎপাদনের সর্বাধুনিক যন্ত্র– আলট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি মেশিন (ইইউভি) বিক্রি বন্ধ করে এর নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক প্রস্তুতকারক এএসএমএল।

তবে অপেক্ষাকৃত কম সক্ষমতার ডিপ আলট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিন দিয়েও চীনা কোম্পানিগুলো উচ্চ মানের সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করতে পারবে।

এ অবস্থায়, চিপ প্রস্তুতকারক সরঞ্জাম বিক্রির নিষেধাজ্ঞার আওতা আরও বাড়ানোর কথা ভাবছে ওয়াশিংটন। আর সেজন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে চীন। এএসএমএল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ডিইউভি মেশিন কিনে মজুত করছে; শুধু গতবছরেই কিনেছে ৮১টি।

তাইওয়ানের শিল্প-প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থার কনসালটিং ডিরেক্টর রে ইয়াং বলেন, ‘ডিইউভি মেশিন দিয়েও এসএমইসি ৭ ন্যানোমিটার চিপ ফ্যাব্রিকেট করতে পারবে, এমনকি বিপুল মাত্রায় উৎপাদন করাও সম্ভব– আর তাতে চীনের গুণগত কার্যকারিতাও খুব একটা কমবে বলে মনে হয় না’।

তিনি বলেন, ‘তবে ডিইউভি রেজ্যুলেশন ব্যবহার করার অর্থ হচ্ছে, এই প্রযুক্তিকে তার সর্বোচ্চ সীমায় ব্যবহার করা। যা একটি সাধারণ গাড়িকে ফর্মুলা ওয়ান রেসের স্পিডে চালানোর সাথে তুলনীয়’।

‘তবে তাতে উৎপাদন হার হয় খুবই কম। অর্থাৎ, মেশিনের ক্ষয় হয় বেশি। একারণেই এটি ৭ ন্যানোমিটারের চেয়েও ছোট অ্যাডভান্সড চিপ প্রসেসিং করতে খুব একটা ব্যয়-সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারবে না, বা তা সম্ভবও নয়’- যোগ করেন তিনি।

ইয়াং জানান, রাষ্ট্রীয় সমর্থন থাকায় তারপরও এসএমইসি কম লাভজনক প্রক্রিয়ায় অত্যাধুনিক চিপ প্রস্তুত করতে পারবে।

তিনি স্থানীয় বাজারের চাহিদার দিকটিও উল্লেখ করেন, ‘এখন হুয়াওয়ের মতো বড় কোম্পানিও বিদেশি ফাউন্ড্রি ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে চিপের জন্য এসএমইসির ওপর চীনের নির্ভরশীলতা বহুগুণে বেড়েছে। হুয়াওয়ে-ও কিনছে তাদের থেকে, হয়তো তারা বিশেষ ধরনের অবাণিজ্যিক গ্রাহকের (যেমন চীনের সামরিক বাহিনী) জন্য এসব চিপ কিনতে পারে। উচ্চমানের চিপস অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র প্রস্তুতেও ব্যবহার করতে চায় চীন। ছবি: ডেমির সাগোলি/ রয়টার্স

চীন ব্যাপকহারে সামরিক সাজসরঞ্জাম আধুনিকায়ন করছে, অত্যাধুনিক এসব অস্ত্রশস্ত্রের জন্যও দেশটির দরকার– আরও উন্নত চিপ।

প্রযুক্তি খাতে চীনের মহাকায় সংস্থা- হুয়াওয়ের সাথে দেশটির সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের মাধাব্যথার কারণ হয়ে আছে। বাইডেনের পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন ২০১৯ সালে কোম্পানিটিকে ‘এনটিটি লিস্ট’ নামক তালিকাভুক্ত করে। এই তালিকায় থাকা কোম্পানির কাছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

এদিকে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে বেসরকারি খাতের প্রযুক্তির অত্যাধুনিক আবিষ্কারকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে নিয়োজিত করা হচ্ছে। এই কার্যক্রমকে দেওয়া হয়েছে জাতীয় অগ্রাধিকারের মতো গুরুত্ব। চীনের শিল্প নীতির স্তম্ভ হয়ে উঠেছে সামরিক ও বেসামরিক প্রযুক্তির এই সম্মিলন।

সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকং- এর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ডগলাস ফুলার বলেন, ‘স্মার্ট অস্ত্রের জন্য অপরিহার্য চিপ। চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অগ্রগতি নিয়ে একারণেই পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা শঙ্কিত’।

৭ ন্যানোমিটারের চেয়ে ছোট চিপ প্রস্তুতে বর্তমানে চীন সক্ষম নয় বলে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন। তবে এই বাধাও অতিক্রম করতে বর্তমানে একযোগে কাজ করছে এসএমইসি এবং সাংহাই মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স ইক্যুইপমেন্ট কোম্পানি। তারা যৌথভাবে এ ধরনের চিপ উৎপাদনে দরকারি যন্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে।

ডিলান প্যাটেল মন্তব্য করেন, ‘তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রথমদিকের এই মেশিনগুলো মাঝেমধ্যেই বিগড়ে যায় বলে এসএমইসির প্রকৌশলীরা অভিযোগ করেছেন, এমন কিছু কিছু গোপনীয়তার জাল ভেঙে ফাঁসও হয়েছে। তাই বলাই যায়, ফলপ্রসু এআরএফ লিথোগ্রাফ মেশিন এখনও তৈরি করতে পারেনি চীন। সর্বোপরি চিপ উৎপাদনে চীন বেশ ক’বছর পিছিয়ে, কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন যন্ত্র উদ্ভাবনের দিক থেকে এই পিছিয়ে থাকা অন্তত এক দশকের’।

সূত্র: আল জাজিরা