আবরার হত্যা: ২০ আসামি শনাক্ত, চার্জশিট নভেম্বরে

CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিষ্পত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়নে মামলার চার্জশিট (অভিযোগ) গ্রহণ করবে বিশেষ প্রসিকিউশন টিম। চলতি মাসেই মামলার তদন্তে শেষ করতে কাজ করতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে নির্দেশনা দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। সেই অনুযায়ী নভেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ আদালতে আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের লক্ষ্য নিয়ে করছেন তদন্ত কমকর্তারা।

তদন্ত কমকর্তারা জানিয়েছেন চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার চার্জশিটে অন্তর্ভুক্তির জন্য ২০ আসামীর আবরার হত্যায় জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে আসামী সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। আসামীদের মধ্যে থাকছেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত ৬ নেতা। এছাড়া সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপের কথোপকথন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে অন্য আসামীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। পরিকল্পনাকারী এবং নির্দেশদাতাদেরও আসামি করা হচ্ছে।

আবরার হত্যা মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম। তারা ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপ, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা এবং ১৬১ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। হত্যায় জড়িত থাকার আলামত হিসেবে আদালতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মশারি টানানোর রড-স্টাম্প, খুনিদের কল রেকর্ড এবং মেসেঞ্জার গ্রুপের কথোপকথন উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে বলে গোয়েন্দারা জানান। আবরারের মরদেহের ফরেনসিক টেস্ট ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এখন তদন্ত কর্মকর্তাদের হাতে।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের সিক্রেট মেসেঞ্জার গ্রুপ পর্যালোচনা করে জানতে পেরেছেন, হত্যাকাণ্ডের আগের দিন আবরারকে নির্যাতনের নির্দেশ দেন ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন। কোনো না কোনোভাবে হত্যায় জড়িত প্রত্যেককেই আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুসরণ করছেন গোয়েন্দারা। তবে ঘটনাস্থলে কৌতূহলবশত যারা গিয়েছিলেন. তাদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না বলেও জানান তারা।

সূত্র জানায়, ৫ অক্টোবর শনিবার বেলা পৌনে ১টায় ১৬তম ব্যাচকে ম্যানশন করে রবিন লিখেন, সেভেনটিনের আবরার ফাহাদকে মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। দু’দিন টাইম দিলাম।পরদিন রোববার রাত ৭টা ৫৫ মিনিটে সবাইকে হলের নিচে নামার নির্দেশ দেন মনিরুজ্জামন মনির। রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আবরারকে নিজ কক্ষ থেকে ডেকে করিডর দিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান সাদাত, তানিম এবং বিল্লাহসহ কয়েকজন। রাত ১টা ২৬ মিনিটে ইফতি মোশাররফ সকাল মেসেঞ্জারে লেখেন, মরে যাচ্ছে। মাইর বেশি হয়ে গেছে।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছে, রাত ১২টা ২৩ মিনিটে আশিকুল ইসলাম বিটু ২০১১ নম্বর কক্ষের দিকে হেঁটে যায়। অমিত সাহার ওই রুমেই আবরারের ওপর শুরু হয় নির্যাতনের স্টিমরোলার। বিটু ওই রুমে যাওয়ার ৭ মিনিট পর বেরিয়ে যান। যাওয়ার সময় তার সঙ্গে কোনো কিছু না থাকলেও বেরিয়ে আসার সময় দেখা গেছে, তিনি একটি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসছেন।

এ বিষয়ে বিটুকে সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গোয়েন্দাদের তিনি বলেন, আবরারকে ডেকে আনতে প্রথমে মনিরের ওপর নির্দেশ আসে। পরে জেমি ও তানিমকে ফোন দিয়ে বলা হয়, আবরারকে ডেকে ২০১১ নম্বর রুমে ডেকে আন। তাকে ওই রুমে নেয়া হলে দু’জন আবরারের দুটি ফোন এবং একজন তার ল্যাপটপ সার্চ করে দেখছিল। আবরারের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গিয়ে লাইক-কমেন্টস দেখা হচ্ছিল। তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ভেতরে ঢুকে দেখলাম, আবরার রুমের ভেতর শুয়ে আছে। আমি সকালকে প্রশ্ন করি, আবরারের এ অবস্থা কীভাবে হল? তাকে কে এভাবে মেরেছে? তখন মনির উত্তর দেয়, অনিক ভাই বেশি মেরেছে।

বুয়েট শিক্ষার্থী অমিত সাহার রুমে এই হত্যার ঘটনা ঘটলেও এখনও তিনি এতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেননি। হত্যাকাণ্ডের সময় ২০১১ নম্বর রুমে তিনি ছিলেন না এই দাবিতে অটল আছেন অমিত। তিনি বলছেন, ইফতি মোশাররফ সকাল ও মোস্তফা রাফি হলো আমার রুমমেট। এ কারণেই আমার নামটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়েছে। যদিও ম্যাসেঞ্জারের বার্তায় হত্যায় অমিত সাহার জড়িত থাকার তথ্য-উপাত্ত গোয়েন্দাদের হাতে আছে। এর ভিত্তিতেই তাকে চার্জশিটে আসামী করা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যাদের নাম চুড়ান্ত হয়েছে, তারা হচ্ছেন- বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক মোজাহিদুল ইসলাম ওরফে মোজাহিদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা মনিরুজ্জামান মনির, ইশতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, অমিত সাহা, মিজানুর রহমান ওরফে মিজান, শামসুল আরেফিন রাফাত, এএসএম নাজমুস সাদাতসহ আরও অন্তত ১০ জন রয়েছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম গণমাধ্যমকে জানান, আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ২০ বা ততোধিকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। মামলার এজাহারে থাকা ১৯ জন আসামীর নাম থাকলেও এর বাইরেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও কয়েকজন চিহ্নিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর বাইরেও সন্দেহভাজন আরও ৩/৪ জন রয়েছে। সবমিলিয়ে আবারর হত্যায় জড়িতে মোট ২৪ জনকে নিয়েই বিচার বিশ্লেষণ চলছে। এদের মধ্যে ২-১ জন হয়তো চার্জশিট থেকে বাদ পড়তে পারে। এজাহারে নাম থাকলে থাকলেও তদন্তে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি, তাদের চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হবে।

আবরার হত্যাকাণ্ডে তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে রাজধানীর চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ। পরদিন রাতেশেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী।