আদিকাল থেকেই বিশ্বের বিদ্যমান পরাশক্তি, উদীয়মান পরাশক্তিকে ভীতির চোখে দেখে

CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

বিশ্বের সৃষ্টি লগ্ন থেকে প্রায় প্রত্যেক শতাব্দীতে এক বা একাধিক পরাশক্তির সৃষ্টি হয়েছে যে দেশগুলি ছিল যথেষ্ট পরিমাণে শক্তিশালী, নেতারা ছিলেন প্রবল ইচ্ছা শক্তির অধিকারী, তাঁদের ছিল উচ্চাঙ্গের মেধা যা দিয়ে তাঁরা তাঁদের ধারণা, মূল্যবোধ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্ব ব্যবস্থায় বিভিন্ন রকম সংস্কার যুগে যুগে সংযোজন করেছেন। আবার এই পরাশক্তি সমূহের পতন হয়েছে, তাঁদের স্থলে নূতন পরাশক্তির আবির্ভাব হয়েছে। বিশ্বের কোন পরাশক্তির পতন আরম্ভ হলে সে পরাশক্তির ক্ষমতাসীনরা বিভিন্নক্ষেত্রে যে আচার-আচরণ করে থাকেন, যুগে যুগে সমস্ত ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তিগুলির আচার আচরণে যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। ইহাই বিধাতার নির্ধারিত বিধান বলেই মনে হয়। যখন কোন পরাশক্তির পতন আরম্ভ হয়, ইহাই স্বাভাবিক যে উক্ত পরাশক্তির নেতৃবৃন্দের বিদ্যমান পতনশীল অবস্থার সাথে সমন্বয় সাধন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বিশ্বের উদীয়মান পরাশক্তির সাথে তাঁদের আচার-আচরণ মাঝে মধ্যে কূটনৈতিক ভব্যতার সীমা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। ১৬২৪ সালে ফ্রান্সে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পর-রাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করলেন, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘রাষ্ট্রের স্বার্থই সবার শীর্ষে।’

১৮ শতাব্দীতে গ্রেট বৃটেন বিশ্বে সবচাইতে শক্তিশালী দেশ হিসাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আবির্ভূত হলো এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য (Concept of Balance of Power) ধারণার প্রবর্তন করল। এই নীতির ভিত্তিতেই প্রায় ২০০ বৎসর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিচালিত হলো। মেটারনিকের নেতৃত্বে অষ্ট্রিয়া ইউরোপের নীতি স্থির করলেন কিন্তু জার্মানীর বিসমার্ক এসে তা অকেজো করে দিলেন এবং তিনি ক্ষমতার রাজনীতির জন্য ঠান্ডা রক্ত খেলাতে নেমে গেলেন।

অবশেষে ১৯১৭ সালে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ ঘটল। সবচাইতে বিস্ময়ের বিষয় হলো বিংশ শতাব্দীতে যেসব আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলি স্বাক্ষরিত হয়েছিল প্রায় সবগুলিতেই আমেরিকার তৎকালের লালিত সব মূল্যবোধগুলি প্রতিফলিত হয়েছে। সবচাইতে উল্ল্যেখযোগ্য হলো ‘লীগ অব নেশনস’ এবং ইউনাইটেড নেশনস চার্টার। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে বিশ্বের সমস্ত অর্থনৈতিক উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের একা অবদান ছিল ৩৫ শতাংশ। ১৯৬১ সালে আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডী ঘোষণা করেছিলেন- America is strong enough to pay any price, bear any burden to ensure success of liberty. অর্থাৎ, ‘আমেরিকা স্বাধীনতার সাফল্যের জন্য যে কোন মূল্য দিতে এবং যে কোন বোঝা বইতে যথেষ্ট শক্তিশালী।’ কিন্তু মাত্র তিন দশক না যেতেই আমেরিকারর সে অদম্য ইচ্ছাশক্তির পতন আরম্ভ হয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো যুগে যুগে বিশ্বের পরাশক্তিগুলি তাদের পতনের কালে নুতন এবং উঠতি পরাশক্তি দ্বারা বর্তমানে সৃষ্ট তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জগুলির কথা স্বীকার করতে চাননা।

বর্তমানে উঠতি পরাশক্তি চীনের ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্র ঠিক একই ভূমিকা পালন করছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ইহাই বিশ্বে নিয়মে পরিণত হয়েছে। মাও সেতুং এর নেতৃত্বে চীনে কম্যুনিষ্ট শাসন কায়েম হওয়ার পরও প্রায় ২৩ বৎসরের উপরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের কোন কূটনেতিক সম্পর্ক ছিলনা। ষাট দশকের শুরুতেই চীনের গুরু প্রতীম বন্ধু রাষ্ট্র সোভিয়েট ইউনিয়নের সাথে আদর্শিক মত পার্থক্য শুরু হয়। চীনের ঘনিষ্ট বন্ধু রাষ্ট্র, আদর্শিক পরামর্শদাতা, অর্থনৈতিক সাহায্য দাতা সোভিয়েট রাশিয়া শত্রুতে পরিণত হয় এবং চীনের উত্তর সীমান্তে সোভিয়েট ইউনিয়ন বিপুল সেনাবাহিনী মোতায়েন করে এবং চীনের বহু শহরকে টার্গেট করে চীন সীমান্তে থেকে মিসাইল হামলার ব্যবস্থা করেছিল। সে সময় থেকে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য গোপন বৈঠক শুরু হয়। এ ব্যাপারে পাকিস্তানই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী, বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কূটনীতিবিদ ড: হেনেরী কিসিঞ্জারের প্রথম চীনে গোপন সফরের ব্যবস্থা পাকিস্তানই সম্পন্ন করেছিল। অবশেষে ১৯৭২ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীনে রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে চীন ও আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্কের শুরু হয়। অতি অল্পদিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে তা বিপুল ব্যাপক এবং বিস্ময়কর।

অতীতকালে চীনের দুঃসময়ে শেষ ছিলনা। ১৯৩৩ দশকে চীন জাপানের নির্দয় আক্রমনের স্বীকার হয়েছিল। চীন সরকারের হিসাব অনুযায়ী জাপানের সে আক্রমণে ২২ মিলিয়ন লোকের মৃত্যু হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে অন্য একটি গৃহযুদ্ধে চীনের ৫ মিলিয়ন লোক মারা গিয়েছিল। মাও সে তুং এর নেতৃত্বে কম্যুনিষ্ট পার্টি চীনের ক্ষমতা দখলের সময় চিয়াং কাইসাকের সাথে ১৯৪৯ সালে ভয়ানক সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষে ও খাদ্য-অভাবে ৭ মিলিয়ন লোকের প্রাণ দিতে হয়েছিল। ১৯৫০ দশকের শেষ দিকে শিল্পায়ন এবং কৃঘিক্ষেত্রে যোৗথ উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করতে গিয়ে কয়েক মিলিয়ন লোকের জীবন অবসান হয়েছিল। সব চাইতে আশ্চর্যের বিষয় হলো বিংশ শতাব্দীরে শেষ দিক পর্যন্ত যে দেশ এত বেদনাদায়ক পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছিল, এক বিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশে পরিণত হলো। আজ থেকে প্রায় ১৯০ বৎসরেরও আগে নোপোলিয়ান চীন সম্পর্কে বলেছিলেন-There lies a sleeping giant, let him sleep. For when he wakes he will move the world. অর্থাৎ একটি ঘুমন্ত সিংহ শুয়ে আছে। তাকে ঘুমাতে দাও। কারণ যখন সে জেগে উঠবে তখন, সে বিশ্বকে নাড়াবে। নেপোলিয়ানের সে কথা আজকে অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে।

বিশ্ব-শান্তির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের, এক কালের দুই পরাশক্তি (ক) ডাচ রিপাবলিক এবং (খ) বৃটেনের আচরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। তখন ডাচ রিপাবলিক ছিল তদানীন্তন বিশ্বের পরাশক্তি। যখন বৃটেনের পরাশক্তি হিসাবে উত্থান আরম্ভ হলো তখন প্রথমদিকে ডাচ রিপাবলিক বৃটেনের উঠতি পরাশক্তি হিসাবে মেনে নিতে কষ্ট হলেও পরে বৃটেনের সাথে ভাল সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল। তাতে ডাচ রিপাবলিক পরাশক্তির মর্যাদা হারালেও শান্তির এবং সম্মানের সহিত তদানীন্তন বিশ্বে ঠিকে ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বৃটেন যখন বৃহৎ শক্তির মর্যাদা হারিয়ে ফেলে তখন বিশ্বের তদানীন্তন উঠতি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগীতার ভিত্তিতে নিজেদের আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ করেছেন। ফলে পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বে বৃটেনের সবচাইতে বিশ্বস্ত এবং শক্তিশালী বন্ধুত্বে পরিণত হয়।

বর্তমানেও বিশ্ব-শান্তির স্বার্থে বৃটেন আমেরিকার সাথে যে সহযোগীতা এবং বন্ধুত্বের ভূমিকা পালন করেছিল এবং যা এখনো অব্যাহত রয়েছে, আমেরিকাও চীনের সাথে তাই করা উচিত হবে। কিন্তু ২০১৭ সালে ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্টর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে আমেরিকার অনেক প্রখ্যাত লোকের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি ঠিক এর বিপরীত অবস্থান নিয়েছেন। বৈদেশিক বাণিজ্যে চীনের সাথে আমেরিকার যে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে তা তিনি এখনই দূর করতে চান। এই ক্ষেত্রে তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নির্ধারিত বিধি বিধান ও মানতে রাজি নন। তার দাবীগুলি একটি মহান দেশের প্রেসিডেন্টের দাবীর মত নয়। আবার জাত ব্যবসায়ীর মতও নয়। আমেরিকার প্রাক্তণ প্রেসিডেন্ট রিকার্ড নিক্সন, যিনি ১৯৭২ সালে নিজে চীন সফর করে চীনের সাথে কূটনেতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন তার লেখা বই Victory without war-নামে বইতে লিখেছেন-In the long run Sino-US relationship will endure not because of fear but because of hope. Nothing will come between us so long as neither side harbored territorial ambitions against other. We have everything to gain. অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত চীন এবং আমেরিকার সম্পর্ক ঠিকে থাকবে ভয়ের কারণে নয় বরং আশার কারণে। আমাদের মধ্যে কোন গন্ডগোল সৃষ্টি হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে একে অপরের ভূমির প্রতি লোলুপ দৃষ্টি না ফেলে।