আইএমএফের শর্ত: ৯০ দিনে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলেই খেলাপি ঘোষণা

ছবি: সংগৃহীত
CPLUSTV
CTG NEWS
CPLUSTV
শেয়ার করুন

সিপ্লাস ডেস্ক: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের কিস্তি না দিলে ৯০ দিনের মধ্যে খেলাপি করার প্রস্তাব এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। এছাড়া, অন্যান্য ঋণের মতো কৃষি ও এসএমই খাতকেও ৯০ দিনের মধ্যে খেলাপি করার ক্ষেত্রেও আপত্তি রয়েছে তাদের।

সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ৪.৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তার শর্ত হিসেবে নির্ধারিত সময়ের ৯০ দিনের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করলে ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি ঘোষণা করার শর্তারোপ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

এমনকি সরকারের নীতি সহায়তার অংশ হিসেবে বাড়তি সুবিধা পাওয়া কৃষি ও এসএমই খাতের ঋণের ক্ষেত্রেও একই শর্তারোপ করেছে সংস্থাটি।

তবে ‘৯০ দিনের বকেয়ার ওপর ভিত্তি করে ঋণখেলাপী’ ঘোষণা করতে নারাজ বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে লেখা এক চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, নতুন এই সংজ্ঞায়নের জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রয়োজন পড়বে।

এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কৃষি ও এসএমই খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফের নীতি অনুসরণ করেই জাতীয় নীতিমালা পরিচালিত হয়।

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) ভিত্তিক প্রভিশন রুল বাস্তবায়ন করতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশের ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফস-এর একটি প্রতিনিধিদল বুধবার থেকে ১৫ দিনের সফরে ঢাকা এসেছে। বুধবার অর্থ সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনসহ অর্থ বিভাগের বিভিন্ন উইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আইএমএফ এর বৈঠক হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ৯ নভেম্বর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সভা করবে আইএমএফ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে আইএমএফ-এর বৈঠকে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট, বিনিময় হারের উন্নয়ন, সাম্প্রতিক বিনিময় হার উন্নয়ন, ২০২১-২২ অর্থবছরের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এবং ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যালোচনা এবং বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ প্রক্ষেপণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে জানা গেছে।

ব্যাসেল- ৩ বাস্তবায়নে কঠিন শর্ত আরোপ

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের কিস্তি না দিলে ৯০ দিনের মধ্যে খেলাপি করার আইএমএফ এর প্রস্তাব এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। এছাড়া, অন্যান্য ঋণের মতো কৃষি ও এসএমই খাতকেও ৯০ দিনের মধ্যে খেলাপি করার ক্ষেত্রেও আপত্তি রয়েছে তাদের।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ২০১৯ সালের মধ্যে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল এবং সে মোতাবেক কাজ করছিল। তখন বিভিন্ন স্তরের খেলাপির জন্য ৯০, ১৮০ ও ৩৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ ছিল। ২০১৮ সালের পরে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আসার পর এসব সময়সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে।

আইএমএফ এখন বিভিন্ন শর্তারোপ করে বাংলাদেশকে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের দিকে নিতে চাচ্ছে। ব্যাসেল-৩ হলো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সেক্টরে নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নতির উদ্দেশ্যে নিররধারিত সংস্কার ব্যবস্থার একটি সেট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বর্তমানে ৯০ দিনের বকেয়া হলে সেসব ঋণকে নন-পারফর্মিং ঋণ (এনপিএল) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সময়ের ছয় মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে খেলাপি ঋণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। খেলাপীদের ঋণ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ৯০ দিনের বকেয়া হলেই কোনো ঋণ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে পরিগণিত হয়।

চলতি অর্থবছর কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর ৩০ হাজার ৯১১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো নিজেরা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। অন্যদিকে, বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের নিট ঋণ ও অগ্রিমের ২ দশমিক ৫ শতাংশ হিসাব করে কৃষিঋণ বিতরণ করে।

এছাড়া, গত অর্থ বছর ব্যাংকগুলো ২০৭,৩৯৫ কোটি টাকা এসএমইখাতে ঋণ বিতরণ করেছে।

ব্যাংকাররা জানান, শস্য ঋণ সাব-স্ট্যান্ডার্ড হয় দুই বছর পর। অন্যান্য কৃষিঋণের ক্ষেত্রে এটি ১৫ মাস। আর এসএমইখাতে বিতরণ করা মধ্যমেয়াদি ঋণগুলোর কিস্তি পরিশোধ না করলে এক বছরের মাথায় তা সাব-স্ট্যান্ডার্ড করে ব্যাংকগুলো।

অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক সিইও মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সারাবিশ্বই কৃষি ও এসএমই খাতকে নানা সুবিধা দিচ্ছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। তাই কৃষি ও এসএমইখাতকে ঋণ পরিশোধে যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তা যৌক্তিক। আইএমএফ-এর চাপে এই মুহূর্তে এতে কোনো পরিবর্তন আনা ঠিক হবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংক এটি কার্যকর করার কথা ভাবতে পারে।

তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এই অবস্থায় কৃষি ও এসএমইখাতকে বাড়তি সুবিধা দিতে হবে। এ দুটিই খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঋণ খেলাপিদের শোধরানোর জন্য সরকার খেলাপি ঋণ পরিশোধে অনেক সুবিধা দিলেও তাতে কোন কাজ হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।’

তিনি বলেন, কৃষি কিংবা এসএমইখাতের ঋণগ্রহীতারা ঋণ নিয়ে যদি পরিশোধ করতে না পারে, তাহলে সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়া উচিত। সব সেক্টরের জন্য একই ধরনের পলিসি থাকা প্রয়োজন।

‘সরকার যদি মনে করে কৃষি ও এসএমইখাতকে বাড়তি সুবিধা দিতে হবে, তাহলে ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া কিংবা ইন্টারেস্ট রেট আরও কমানো যেতে পারে। না হলে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার মানসিকতা বাড়তে পারে’- জানান তিনি।

ইসিএল নির্ভর প্রভিশনিং

লোন লস প্রভিশনিং (এলএলপি)-র নিয়ম অনুসারে, ব্যাংকগুলোকে আনক্লাসিফায়েড ঋণের বিপরীতে এক থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত জেনারেল প্রভিশন এবং নন-পারফর্মিং ঋণের বিপরীতে ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্পেসিফিক প্রভিশন বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায় ইসিএল ভিত্তিক প্রভিশনিং নীতি বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রচুর রেকর্ডকৃত পুরোনো তথ্যের প্রয়োজন। কোভিডের আগে বাংলাদেশে ইসিএল ভিত্তিক প্রভিশনের সম্ভাব্যতা জরিপ যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল।

ব্যাংক সূত্র মতে, তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ অনেক ব্যাংকই মাত্র কয়েক বছর আগে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অটোমেশন চালু করেছে। সুতরাং যে পরিমাণ পুরোনো তথ্য প্রয়োজন তা বর্তমানে নেই।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক কোভিড পরিস্থিতির কারণে উদ্যোগটি বন্ধ করে দেয়। তাছাড়া এখনও বেশকিছু প্রণোদনা চলমান। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্যোগটি নতুন করে নেওয়া কঠিন হবে।

বর্তমানে শ্রীলঙ্কা  ও মালয়েশিয়া ইসিএল নির্ভর প্রভিশনিং নীতি অনুসরণ করে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তান রুল-নির্ভর প্রভিশনিং অনুসরণ করে থাকে।

গত সেপ্টেম্বরে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর শক্তিকান্ত দাস বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসিএল নির্ভর প্রভিশনিং চালু করতে ইচ্ছুক এবং শিগগিরই আলোচনার ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রস্তাবনা প্রকাশিত হবে।

২০০৭-০৮ বছরের বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার পরেই ইসিএল ভিত্তিক প্রভিশনিং চালু হয়। এর অর্থ ব্যাংকগুলো ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থা ও  ঋণ ঝুঁকি নির্ণয় করবে এবং সেই অনুযায়ী খেলাপী ঋণ থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা ১২ মাস থেকে দীর্ঘমেয়াদী হিসাবে প্রকাশ করবে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এখন থেকে সম্ভাব্য ক্ষতির কাঠামোতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম এবং ব্যাংকিং সিস্টেম বিবেচনায় নিলে এখনই ইসিএল প্রভিশনিং রুল পদ্ধতিতে যাওয়া সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে একটি ব্যাংকের লাভ-ক্ষতি কতো, তা কোনো ব্যাংকের পক্ষে তাৎক্ষণিক হিসাব করা সম্ভব নয়। তবে সময়ের সঙ্গে নতুন সিস্টেম বাস্তবায়ন করতে হবে।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তিকে ‘এড়িয়ে চলার কৌশল’ বলে মনে করছেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ১৯৯০ সাল থেকে খেলাপি ঋণের তথ্য রয়েছে। বিআইবিএম, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফ এর গবেষণাও রয়েছে।

‘কোন খাতে ঋণ দিলে ঝুঁকি বেশি, কোন খাতের ঋণে ঝুঁকি কম, তার তথ্য বিভিন্ন পর্যায়ে আছে’- যোগ করেন তিনি।

ঋণ পেতে আশাবাদী অর্থসচিব

আইএমএফ টিমের সঙ্গে সভা শেষে অর্থ সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের বলেছেন, আইএমএফ কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। এই ঋণ পেতে কোন সমস্যা হবে না বলে জানান তিনি।

‘আজ প্রথম বৈঠক হয়েছে। সামনে আরও বৈঠক হবে’- জানান তিনি।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফের প্রতিনিধিদল বুধবার অর্থ বিভাগের ট্রেজারি এন্ড ডেবট ম্যানেজমেন্ট উইং, বাজেট উইং-এর সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেছে। এছাড়া, অর্থ সচিবের নেতৃত্বে সামষ্টিক অর্থনীতি উইং-এর সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছে আইএমএফ কর্মকর্তারা।

সভাগুলোতে উপস্থিত ছিলেন অর্থ বিভাগের এমন একাধিক কর্মকর্তারা জানান, রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

এছাড়া, ব্যাংক ঋণের সুদহারের ওপর আরোপিত ক্যাপ প্রত্যাহার করা, মুদ্রা নীতি বাস্তবায়ন করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা ও বাজার নির্ধারিত বিনিময় মূল্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ।